কমরেড অমল সেন: আমি ত্যাগী,বৈরাগী বা সন্ন্যাসী নই,শ্রমজীবী মানুষের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার লড়াইয়ের সৈনিক : জনগণের কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণই হচ্ছে বিপ্লবী জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ: নিজের সম্পর্কে অমল সেন: জনগণের নিজস্ব শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠলে সমাজে পাল্টা রাজনৈতিক শক্তি বিকশিত হবে- মনে করতেন অমল সেন : শ্রমজীবী জনগণের রাজনীতি বিকশিত হোক- অমল সেনের সাধনা ছিল!
কমরেড অমল সেন বলেছেন তাঁর জন্ম ১৯১৪ সালে। তাঁর মৃত্যু হয় ১৭ জানুয়ারি, ২০০৩ সালে। নব্বই উর্ধ্ব জীবন পেয়েছিলেন তিনি। নড়াইলে জন্ম তাঁর এক জমিদার পরিবারে। শিক্ষা শুরু হয়েছিল বসুন্দিয়া হাই স্কুলে। তারপর খুলনা জিলা স্কুল। নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। তারপর খুলনা বিএল কলেজে গণিতে সম্মানএ ভর্তি হন। কিন্তু ইতিমধ্যে তিনি গোপন অনুশীলন সমিতির হাত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই সব কারণে পড়াশোনা আর এগিয়ে নেননি। তিনি ১৯৩৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। বৃটিশ আমলে বিপ্লবী বা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হওয়া বেশ কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। অমল সেন তাই বেছে নিলেন। বৃটিশ উপনিবেশ, কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগের রাজনীতির বিরোধীতা করে কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হওয়া ছিল সময়ের সাহসী পদক্ষেপ। কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হতে গিয়ে তিনি আরেকটা কাজ করলেন। তিনি জমিদারী উত্তরাধিকার ছেড়ে জমিদার বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং নিজেকে নিম্ন বর্ণের বা শূদ্রের জীবনে মিশিয়ে ফেলার চর্চায় গেলেন। এটাকে রাজনীতির ভাষার শ্রেণিচ্যুতি বলে কিন্তু অমল সেন বর্ণচ্যুতির কথাও বললেন। সেই তিরিশের দশকে এটা একটা মহৎ বিপ্লবী রুপান্তর। অনেকে এই প্রক্রিয়ায় এসে আবার স্ব শ্রেণি বা স্ব জাতিতে ফিরে গিয়েছিলেন, অমন সেন তাঁর ব্যতিক্রম ছিলেন। অকৃতদার অমল সেন সারা জীবন শূদ্র ও মুসলমানের কাতারে নামিয়ে এনে একটা সেক্যুলার জীবন যাপন করেছেন। তবে তাঁর ব্যক্তিত্বে একটা অভিজাত ও শিক্ষার ছাপ ছিল।
অমল সেনের কমিউনিস্ট জীবনের বড় সাফল্য হলো ১৯৪৬ সালে পূর্ব বাংলার বড় আন্দোলন তথা তেভাগা আন্দোলন। একজন বর্গাচাষী ফসলের তিন ভাগের ভাগ পাবেন। উত্তরবঙ্গে এই আন্দোলন সহিংস হয় কিন্তু নড়াইলে সহিংসতা এড়িয়ে অমল সেন সফলতা নিয়ে আসেন। উল্লেখ্য তিনি রণধীবের সশস্ত্র সংগ্রামের বিরোধী ছিলেন। এখানেই তিনি শিখেছেন, জনগণকে তার শক্তিতে বলীয়ান করতে পারলে একটা পাল্টা শক্তি তৈরি হয় যার ফলে গ্রামাঞ্চলে একটা শ্রেণিশক্তির বিকাশ লাভ করে। এটার বিকাশ ঘটে তার পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে অনেক হিন্দু ভারতে চলে যান। এইসময় একটা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়। সাধারণ হিন্দু বিশেষ করে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা ভারতে চলে যান। নির্মল সেন বলেছেন, তিনি এবং অমল সেনের মতো কতিপয় কমিউনিস্ট হিন্দু পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের আবহে থেকে যান। একটা অসমসাহসী সিদ্ধান্ত। নির্যাতন, আত্মগোপন জীবন এবং জেলই যার পরিণতি। অমল সেন পাকিস্তানের তেইশ বছরে সতের- আঠারো বছর জেলে ছিলেন। তখনকার কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক জীবন পরিচালিত হতো অনেকটা জেলে বসেই।
এই সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিতর্কে চীনের পক্ষে থাকলেও তিনি সত্তরের দশকে নকশালপন্থী ধারণা বিরোধী ছিলেন। চীনপন্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকেন এবং বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাথে যুক্ত হন। তিনি স্বাধীনতাত্তোর কালে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই পার্টি পরে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টিতে পরিবর্তীত হন। ঐক্যের ধারায় এই পার্টি ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নামে পরিবর্তীত হয়। তারপর নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নানান ভাঙা গড়ার মধ্যে অমল সেন ঐক্যের উপর জোর দিতেন। পরবর্তীতে তিনি ঐক্যের ধারায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ঐক্যের ধারায় যুক্ত হন। এবং ১৯৯২ সালের ঐক্য কংগ্রেসে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ২০০০ সাল পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে কাজ করেন। অমল সেনের অনন্যতা হলো, তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা নিয়ে ভেবেছেন এবং এই নিয়ে লিখেছেন। তাঁর মতে, মতপার্থক্য হলেই পার্টি ভেঙে অন্য পার্টি গড়তে হবে তা সঠিক নয়। তিনি কমিউনিস্টদের জনগণের আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকতে বলেন। বিশেষ করে কৃষক আন্দোলনকে বিভক্ত না করে সংগ্রাম গড়ে তোলার কথা বলতেন। কৃষক আন্দোলন তৈরি হলে সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করা যাবে। তিনি মনে করতেন, পার্টির একনায়কতন্ত্র বা আমলাতান্ত্রীকতা কাম্য নয়।দরকার গনতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার চর্চা। তিনি মনে করতেন, প্রচলিত সংসদীয় ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া যাবে তবে জনগণকে সেই ব্যবস্থার দূর্বলতা সম্পর্কে সজাগ করার জন্য যাতে তারা নিজেদের আন্দোলন ও ক্ষমতা তৈরি করতে সমর্থ হয়। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটে তাঁর শ্রমজীবী জনগণের রাজনীতি এবং পার্লামেন্টরি শাসন ব্যবস্থা নামক প্রবন্ধটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যাইহোক, এদেশের কৃষক সমাজের মুক্তি আন্দোলন খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারতেন অমল সেন। তাঁর লেখা নড়াইলের তে- ভাগা সংগ্রামের সমীক্ষা পাঠ করলে তাঁর কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে প্রজ্ঞা জানা যাবে। তাঁর এই লেখাটা মাঙ সে তুঙের হুনান প্রদেশের কৃষক আন্দোলনের রিপোর্টের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
কমরেড অমল সেন আজীবন শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য কাজ করেছেন, এদেশের জনগণকে ক্ষমতায়িত করার জন্য। তাঁর আত্মত্যাগ, তাঁর বৈরাগ্য, তাঁর সন্ন্যাসীর জীবন ছিল আসলে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরির লড়াই।
যুগ যুগ জিও কমরেড অমল সেন।
লেখক- শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক



