30 C
Dhaka
বৃহস্পতিবার, জুন ২৪, ২০২১

অনলাইন টিভি

Bangladesh
866,877
কোভিড-১৯ সর্বমোট আক্রান্ত
Updated on June 24, 2021 11:00 AM
Homeসম্পাদকীয়উপ-সম্পাদকীয়উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এখনই রুখতে হবে

উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এখনই রুখতে হবে

।। আবদুল হাকিম ।।

নামেই হেফাজতে ইসলাম, কামে ইসলাম রক্ষার বালাই নাই। বরং কাজে কর্মে কথাবার্তা, চালচলনে আর আচার-আচরণ ও নীতি-আদর্শ এবং ব্যক্তি কিংবা সমষ্টিকতায় ইসলাম খুঁজে পাওয়া যায় না। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম, মানবকল্যাণে নিবেদিত ধর্ম তা এদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। যে ইসলাম প্রতিবেশির খোঁজ না করে রাতের খাবার গ্রহণে সায় দেয় না, যে ইসলাম নারীর মর্যাদা প্রদানে শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার, যে ইসলাম সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জীবন বিধান, সেই ইসলামের হেফাজতকারী হয়ে হেফাজত নারী মুক্তির বিরোধীতা করে নারী জাতির অমর্যাদা করে যাচ্ছে। যে ইসলাম আপন তৃষ্ণা না মিটিয়ে অন্যের তৃষ্ণা মেটাতে উপদেশ দেয়, যে ইসলাম আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী তথা দেশের সম্পদ রক্ষায় নিবেদিত, সেখানে এ হেফাজত ইসলাম হেফাজতের নামে জ্বালাও পোড়াও করে নাশকতা সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারি সম্পদ, জনগণের সম্পদ নষ্ট করেই ক্ষান্ত হয় না; মানুষ হত্যা করতেও এদের বুক কেঁপে উঠে না। দেশে এ ধরণের হেফাজতে ইসলামের কি কোনো প্রয়োজন আছে? যে হেফাজতে ইসলামের ধর্মীয় নেতা, আলেম ওলামারা মানুষ খুন করে , সরকারি, বেসরকারি স্থাপনায় আগুন দিয়ে সম্পদ নষ্ট করে তারাতো আলেম হতে পারে না। তাদেরকে রীতিমতো জালেম বললেও বেশি বলা হবে না। যে দেশে এরকম আলেম ওলামা থাকে সে দেশের বিদ্যামান ইসলামের কি গতি হবে, একবার ভাবুন? সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ দেয়ার প্রচলন করার জন্য যার পর নেই চেষ্টা করছিলেন। এ কথা জানতে পেরে উপন্যাসিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে কটাক্ষ করে বলেছিলেন,“পাক ভারত উপমহাদেশে নাকি একজন প-িত লোকের আর্বিভাব ঘটেছে। তিনি নাকি বিধবা বিয়ে দিতে চান, তিনি যদি পণ্ডিত হন তবে মুর্খ কে!” সাম্প্রতিককালে হেফাজতের নাশকতার তা-ব প্রতিরোধ করছে বাংলাদেশ সরকার। হেফাজতের কথিত আলেম “ওলামাকে বিভিন্ন মামলার আসামি হিসাবে গ্রেফতার করছে। তাদের মুক্তির জন্য হেফাজতের বড় চেলা গোছের নেতা বাবুনগরী এই বলে বিবৃতি দিয়েছেন যে, “সরকার দেশের ধর্মীয় নেতা আলেম ওলামাদের নির্বিচারে গ্রেফতার করছে। তাদের আশু মুক্তি দাবি করছি।” বাবুনগরীর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ধর্মীয় নেতা ও আলেম ওলামাদের গ্রেফতারে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের মুক্তি দাবি করেছেন। যারা পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফ পোড়ায়, যারা নাশকতা সৃষ্টির তা-ব করে মানুষ খুন করে, সরকারী স্থাপনায় আগুন দিয়ে জনগণের সম্পদ পোড়ায় ইতিহাস ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ভাস্কর্য ধ্বংস করে, তারা যদি ধর্মীয় নেতা হন, তারা যদি আলেম ওলামা হন তা হলে জালেম কে? ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী, অনিষ্টকারী মুসলমান দলভূক্ত হতে পারে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগমনকে কেন্দ্র করে যারা ব্রাহ্মনবাড়িয়া, নারায়নগঞ্জ, হাটহাজারী, নাসিরনগর, শাল্লা প্রভৃতি স্থানে তা-ব করে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তারা আর যা হোক আলম হতে পারে না। বলা আছে শেষ জামানায় একদল লোক বের হবে যাদের দেখলে মনে হবে একেবারেই খাঁটি মুসলমান। পোশাকে মোশাকে, কথাবার্তায়, চলেন বলনে মনে হবে এরা ইসলামের সেবক। কিন্তু এটা তাদের বাইরের পরিচয় ভেতরে ভিতরে ইসলামের শত্রু, ইসলাম ধ্বংসের ছদ্মবেশী জালেম আই.এস, তালেবান, হেফাজত, জামাাত এবং এই শ্রেণীর অন্যান্য মুখোশধারীরা এদেরই দলভূক্ত। এদের হাত থেকে ইসলামকে রক্ষা করতে সাধারণ মুসলমানদের এগিয়ে আনতে হবে। বিদ্যমান মাদ্রাসা শিক্ষাকে তালেবান মুক্ত করা খুবই জরুরি। এরাই ইসলামের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলো এবং এখনো করছে। এরাই ফতোয়া দিয়েছিলো বাঙালি নারীরা গণিমতের মাল। অতএব এদেরকে পাকিস্তানি জান্তার ভোগের সামগ্রী করা জায়েজ। এরাই পাকিস্তানি জান্তার সাথে একাট্ট হয়ে বাঙালিদের ঘরবাড়ি জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলো। সে শিক্ষা থেকেই তারা এখনো জ্বালাও পোড়াও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদের বিরোধিতা করার কারণেই দেশের নারী অধিকার সংরক্ষণের দলিল নারী নীতি আলোর মুখ দেখে নি। এদেরই বিরোধীতা করার কারণে নারী সুরক্ষা নারীমর্যাদা, নারী অধিকার, ন্যায় বিচারের প্রতিক হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে স্থাপিত নারী ভাস্কর্য স্থানান্তর করতে সরকার বাধ্য হয়েছে। হেফাজত অধ্যুষিত ব্রাহ্মনবাড়িয়া তালেবানি জেলায় পরিণত হয়ে মাঝে মাঝে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রনচ্যুত হয়ে পড়ে। এরা জামাই আদর পাবার কারণে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সাম্প্রদায়িক শিক্ষায় পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান কওমিয়া মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয় না। এরা বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় ১লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে না, করতে বাধা দেয়। বাঙালির জাতীয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস, বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপন করে না। এরা আইএস তালেবান আর পাক সার জমিন সাদবাদে বিশ্বাসী। বাঙালি হয়ে বাংলাদেশ নামক দেশটাকে পাকিস্তান আফগানিস্তান বানাতে চায়। এদেশেরটা খাবে, এদেশেরটা পরবে, এদেশের আলো বাতাসে মানুষ হবে আর এদেশের শিক্ষা সংস্কৃতি শিল্প ইতিহাস ঐতিহ্য বিশ্বাস করবে না, তা হতে পারে না। এদেশে থাকতে হলে, এদেশের নাগরিক অধিকার ভোগ করতে হলে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী হয়ে এদেশের শিক্ষা সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিশ্বাস করতে হবে। আর তার না হলে যে দেশে শেখ মুজিব নেই, মওলানা ভাষানী নেই , মুক্তি যুদ্ধের চেতনা নেই, শহীদ দিবস নেই, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”র মত মধুময় জাতীয় সংগীত নেই, বাংলা নববর্ষ নেই, বাংলাভাষা এবং বাঙালি নেই, যে দেশ পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধা সুগন্ধার নিত্য কলতানে মুখরিত হয় না, যে দেশে বারোমাসে তের পার্বন নেই, যে দেশে জারি-সারি ভাটিয়ালী ভাওয়াইয়া ঘান নেই, যে দেশে গাজী কালু চম্পাবর্তী, গুনাই বিবি, আসমান সিং পদ্মবতির মত অসাম্প্রদায়িক লোক কাহিনী-লোক গীতি নেই, যে দেশে মাকে মা-বাবাকে বাবা বলে ডাকে না, যেদেশে মসজিদের আযান আর মন্দিরের কাসর একাকার হয়ে সন্ধ্যা আর ভোরের বাতাস মুখরিত করে না, যে দেশে রোদেলা দুপুরে কিশোর কিশোরী খাল বিল আর হাটুজলা পুকুরে কাদা আর মাটি পায়ে মেখে জলকোলি করে না, যে দেশে কলমি আর শাপলা শালুক চাঁদোয়া রাতে ঝিলের জলে ভাসে না সেই দেশে তলপাতলপীসহ চলে যেতে হবে। আর এ দেশে বসবাস করতে হলে এদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস হতে হবে। কওমিয়া এবং দেশের ভিন্নধারায় প্রচলিত মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীর দেশের কৃষক শ্রমিক আর মেহনতি মানুষ যারা মহান উৎপাদনের সাথে জড়িত তাদের সাথে এদের কোনো সর্ম্পক নেই। কথা সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ভাষায় চরে আটকে পড়া বিগত শতাব্দীর অচল কেতাব মুখস্থ করে শুধু পাজামায় গিট্টা দেয়া শেখা ছাড়া আর কোনো যোগ্যতা এদের থাকে না। এরা কথায় কথায় নামের সাথে মুফতি, মাওলানা বিশেষণ জুড়ে দিয়ে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, ধর্মান্ধ মানুষের কাছে খ্যাতির নেয়। দেশের সামাজিক কল্যাণে এরা কোনো অবদান রাখার মানবিক যোগ্যতা অর্জন করতে শিখে না।
বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ পশ্চাৎমুখীন মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণা, জগৎ জীবন সম্পর্কে অপব্যাখ্যা, উগ্র জঙ্গীবাদ, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদে বিশ্বাসী হাটহাজারী মাদ্রাসা, মৌলবাদ অধ্যুাষিত মাদ্রাসা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল কওমি মাদ্রাসা এবং দেশের এধরণের মাদ্রাসার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। এ সকল মাদ্রাসার যারা শিক্ষক তাদেরর আধুনিক যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। যাতে সৃজনশীল মানব উন্নয়নে, জাতীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পকলা চর্চায় মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী তথা সকল শিক্ষকরাও পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে। স্থাপত্য, ভাষ্কর্য, চিত্র, সংগীত ও সাহিত্য নির্মাণে এরাও উদ¦ুদ্ধ হয়ে উঠে। শুধু পারলৌকিক’ই নয় ইহলোকিক ও জাগতিক ধ্যান ধারণায় আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ধর্মের আশ্রয়ে যে শিক্ষা প্রচলিত আছে সে শিক্ষা যেন ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যেন মানব সম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। শুধু নারীদের গৃহবন্ধী করে রাখতে পারলেই ধর্ম পালন করা হয় না। এ জন্য উচিৎ সমস্ত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং উপযুক্ত পাঠ্যসূচি তৈরী করা। যাতে করে মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা মনুষ্যত্ব, এবং মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবন ও জীবিকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠে। উগ্র মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করে উদারনৈতিক জীবন দর্শন, সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে শিখে। শুধু আখেরাত, ওয়াজ নছিহত, মাছলামাছায়েলা, নারী পর্দা, হায়েজ-নেফাজের বিবরণ, আরকাম-আহকামের বিবরণ, অজু গোছলের বিবরণ, তিন তালাকের বিবরণ, নিকা দেয়ার বিবরণ, প্রভৃতি শিখে দিন খোজরান না করে এমন পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা প্রয়োজন যাতে করে শিক্ষার্থীরা নাগরিক অধিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য, উৎপাদন, শ্রম ও শ্রমের মর্যাদা, নারী অধিকার, কৃষ্টি ও সভ্যতার প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয়। শওকত ওসমানের ভাষায়, “যাদের একটা সুঁই তৈরী করার মুরোদ নেই অথচ ইহুদি নাছারাদের কষে গাল দিতে পটু।” আত্মনির্ভরশীল দেশ প্রেমিক উন্নত জাতি গঠন করতে হলে দেশে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার বিশাল অংশ জুড়ে যে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে তাকে ঢেলে সাজাতে না পারলে শাপলা চত্বরের ঘটনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার পরিণতি হেফাজত থেকে জামাত, জামাত থেকে তালেবান, তালেবান থেকে আইএস অতঃপর পাকিস্তান আফগানিস্তানের পরিণতি ভোগ করতে হবে।
হেফাজত কর্তৃক ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর অবরোধ করে সরকার উৎখাতের ২৪ ঘন্টার আলটিমেটাম ছিলো বাংলাদেশকে তালেবান রাষ্ট্র বানানোর প্রথম ট্রায়াল। আর ২০২১ সালের ২৬-২৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে হাটহাজারী পর্যন্ত ব্যাপক নাশকতার তা-ব দেশ দখলের ২য় ট্রায়াল। বিলক্ষণ তারই আলামত সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহ। ৩য় ট্রায়ালে “ তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে” অতএব সাধু সাবধান।
লেখকঃ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি আগৈলঝরা, বরিশাল।

সর্বশেষ

×

আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ