বুধবার,১৯,জুন,২০২৪
29 C
Dhaka
বুধবার, জুন ১৯, ২০২৪
Homeজীবন সংগ্রামকৃষকের হক লুটেছে লুণ্ঠনকারীরা

কৃষকের হক লুটেছে লুণ্ঠনকারীরা

                              ৬ বছরে সারে ভর্তুকি ৫৭ হাজার কোটি টাকা

নতুন কথা ডেস্ক ॥ কৃষকের সুবিধায় সারে ভর্তুকি দেয় সরকার। কিন্তু গত ৬ বছরে ভর্তুকির ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশির ভাগই গেছে মধ্যস্বত্বভোগী লুণ্ঠনকারীদের পেটে। তারাই লুটেছে কৃষকের হক। এর সামান্য অংশ পেয়েছে প্রকৃত সুবিধাভোগী কৃষক।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইউরিয়া এবং নন-ইউরিয়া উভয় মিলিয়ে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ সাল পর্যন্ত ছয় অর্থবছরে সার খাতের ভর্তুকিতে সরকারের বরাদ্দ ছিলে ৫৭ হাজার কোটি। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪৭৩ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬ হাজার ৭১৬ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪২১ কোটি ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯৪২ কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়া হয়। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকার একটা বড় অংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে আমদানির জন্য। কিন্তু পরে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) দপ্তরের নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, ওই বছর শুধু সার পরিবহনকারী ঠিকাদারদের মাধ্যমেই বিসিআইসির প্রায় ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার সার আমদানিতে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের হিসাব নিরীক্ষায় দেখা গেছে, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের কাছে ২০১ টন রক সালফার বিক্রি করেছিল। রক সালফার কারখানায় পৌঁছলেও তার বিপরীতে মূল্য বাবদ ৬৯ লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৭ টাকা পরিশোধ করা হয় নি। এ ক্ষতিও সরকারকে বহন করতে হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে পরিবহন ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে নানা আর্থিক অনিয়ম হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অডিটে দেখা গেছে, পরিবহন ঠিকাদাররা সার উত্তোলনের পর বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়ার চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিন পরও সে সার পৌঁছে দেয় নাই। এতে হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সরকার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই নিরীক্ষা কার্যক্রম চালাতে গিয়ে দেখা যায়, এক হাজার টন ইউরিয়া সার বগুড়ার বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়ার জন্য মেসার্স পোটন ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়েছিল বিসিআইসি। নির্ধারিত সময়ের সোয়া দুই বছর পরও সে সার গ্রহণের কোনো রশিদ (এমআরআর) দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট গুদাম কর্তৃপক্ষ।

তাছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আমদানীকৃত সারের অডিট করতে গিয়ে সিএজি দেখতে পেয়েছে, পরিবহন ঠিকাদাররা ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৫৭ টন সার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে রেখে দিয়েছে। কিন্তু সে সময় বিসিআইসির ট্রেড গ্যাপ অ্যাকাউন্টসে ট্রানজিট সারের পরিমাণ দেখানো হয় ২ লাখ ৭০ হাজার ১৬৯ টন। অর্থাৎ এ অর্থবছরে ট্রানজিট সারের পরিমাণ কম দেখানো হয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৮ টন, যার বাজারমূল্য ছিল ১ হাজার ৮৩৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। আট পরিবহন ঠিকাদার কোম্পানির কাছে এ সার সংরক্ষিত ছিল।

২০১৯-২০ অর্থবছরে পরিবহন ঠিকাদার পোটন ট্রেডার্সের অনুকূলে ৯ হাজার ৮০০ টন সার নির্ধারিত বাফার গুদামে পৌঁছানোর কার্যাদেশ দেয়া হয়। নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও ৪ হাজার ৫১১ টন সার পৌঁছানো হয় নি। এতে সরকারের ১৩ কোটি ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।

একই অর্থবছরে নবাব অ্যান্ড কোম্পানি নামে আরেকটি ঠিকাদার কোম্পানিকে ৫ হাজার ৫০০ টন ইউরিয়া সার পৌঁছানোর কার্যাদেশ দেয়া হয়। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও জেএফসিএল গুদামে ৪ হাজার ৩৯৪ টন সার না পৌঁছানোয় ১২ কোটি ৬৯ লাখ ১৯ হাজার টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয় সরকার।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের সার বিক্রির অর্থ আদায় নিয়েও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আখ চাষের জন্য রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেডকে ১ হাজার ৩৫০ টন এবং মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেডকে এক হাজার টন সার বরাদ্দ দেয়া হয়। অগ্রিম মূল্যে সার বিক্রির কথা থাকলেও তা না করে বাকিতে সার বিক্রি করা হয়। পরে সে অর্থ পরিশোধ করেনি এ দুই কারখানা। এতে সরকার ৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

এভাবে ভর্তুকির টাকা গেছে লুঠণ্ঠনকারীদের পেটে। আর বেশি দামে সার কিনে লোকসান গুনতে হয়েছে সাধারণ কৃষককে। কৃষি বিশ্লেষকদের মন্তব্য দুর্নীতি-লুটপাটের দোহাই দিয়ে সারে ভর্তুকি বন্ধ করলে হবে না, বরং দুর্নীতি-লুটপাট প্রতিরোধ করে কিভাবে তা কৃষকের ঘরে ঘরে পৌঁছানো যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।

সর্বশেষ