প্রচ্ছদসম্পাদকীয়মুক্তমতচট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী: প্রতিশ্রুতির রাজনীতি বা রাজনীতির প্রতিশ্রুতি

চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী: প্রতিশ্রুতির রাজনীতি বা রাজনীতির প্রতিশ্রুতি

চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী : প্রতিশ্রুতির রাজনীতি বা রাজনীতির প্রতিশ্রুতি : ঘোষণা হলেও বাস্তবায়ন নেই : রাজনীতি ও আমলাতন্ত্র : বাধা কোথায় : অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ উন্নয়নের শর্ত: ঢাকা সব হেড অফিসের ব্লাকহোল: অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত হবে বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়নে : বাস্তবতা নাকি প্রতিশ্রুতির কুহেলিকা! /?
এটা মোটামুটি একটা বহুশ্রুত প্রতিশ্রুতি চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এটার একটা সম্মোহনী সুর আছে। চট্টগ্রামবাসী এবং ব্যবসায়িরা বেশ মোহিত হন এই প্রতিশ্রুতিতে। কিন্তু দিল্লি হনুজ দূরস্ত! চট্টগ্রাম একটা বন্দর নগরী – এটা যেকোনো রচনার প্রথম বাক্য হয়। এই বন্দর সুপ্রাচীন। এই বন্দরের হাজার বছরের কর্মকান্ডের লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়। আরব বণিক বা ইতিহাসের সিল্ক রোড়ের নথিতে চট্টগ্রাম বন্দর বেশ প্রণিধানযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে এই বন্দরের আন্তর্জাতিক পরিধি ক্রমপ্রসারমান। আর বন্দর হলেই তা শিল্পায়নের শহর হয় – তাও এই শহরের আছে। এখনতো চট্টগ্রাম বন্দর এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর একে অপরের পরিপূরক। অর্থাৎ, শিল্পায়ন, আমদানি রপ্তানি এবং রাজস্ব আয়ের দিক থেকে চট্টগ্রাম বন্দর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জিডিপিতে চট্টগ্রামের অবদান বারো শতাংশের অধিক। তাহলে বাণিজ্যিক রাজধানী হতে বাধা কোথায়?
প্রথম বাধা হলো বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলে যেকয়টি দপ্তরের হেড অফিস চট্টগ্রামে ছিল সেসব এখন ঢাকায়।  বাংলাদেশের কোনো ব্যাঙ্ক বীমার হেড অফিস চট্টগ্রামে নেই। রেলওয়ের হেড অফিস নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষ থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নৌ মন্ত্রণালয়। আগে আমদানি রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল চাক্তাই খাতুনগন্জ। এখন তার সেই জৌলুস নেই। দ্বিতীয় বাধা হলো, আমলাতন্ত্র চায় না বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ হোক। এমনকি সচিবালয় পর্যন্ত ঢাকার আশেপাশে নিতে চান না তারা। বহু দেশ প্রশাসনিক রাজধানী একটু বাইরে রাখে। বাংলাদেশের আমলারা মতিঝিল – রমনার বাইরে কোনো ভাবেই যেতে চান না। ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোও এখন বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। একই জায়গায় প্রশাসন, বাণিজ্য, শিক্ষা এবং আবাসিক এলাকা।  সকালে সবাই মতিঝিলমুখী। পুরো বাংলাদেশ মতিঝিল রমনায় এসে হাজির হয়। যেনো একটা ব্লাকহোল। বাংলাদেশের সব সিদ্ধান্ত, বিচার আচার সবই মতিঝিল রমনার ভেতরে। ফলে এই দেশের কোনো চট্টগ্রাম নেই, খুলনা নেই, রাজশাহী বা সিলেট নেই। আছে শুধু ঢাকা।
বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতিমালা তৈরি হয় বিশ্বব্যাঙ্ক আইএমএফের পরামর্শে।এখানে উন্নয়ন মানে প্রকল্প বা প্রজেক্ট। তা মেগা হোক বা কালভার্ট হোক। সিদ্ধান্ত সচিবালয়ে বা মন্ত্রণালয়ে। সব ঢাকায়। রাজশাহীর, খুলনার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই বাছাই হয় না। এখন নদীভাঙা মানুষও ঢাকা চেনে। অন্য কোথাও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নেই। সেখানে বাণিজ্যিক রাজধানী কাজীর খাতায় আছে, গোয়ালে নেই।এখনো চট্টগ্রামে সম্ভাবনা কম নয়। শুধু দরকার আমলাতান্ত্রিক সদিচ্ছা। রাজনীতিবিদগণ ১৯৯২ সাল থেকে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। ২০০৩ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করা হয়।  কিন্তু এখনো তা মোহনীয় প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটা গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। চট্টগ্রাম, খুলনা এবং রাজশাহীসহ অন্য এলাকার অর্থনৈতিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এগিয়ে যাবে নচেৎ ঢাকায় সব রক্ত জমা হয়ে থাকবে। সামগ্রিক উন্নয়ন হবে না।
আমলাতান্ত্রিক সদিচ্ছায় বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশন অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের নীতি নিয়ে বাণিজ্যিক রাজধানীর পরিকল্পনা নিলে তা হয়তো বাস্তবায়ন করা যাবে। এর সাথে যোগ করতে হবে,  বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রকল্প। বিশ্বব্যাঙ্ক এবং আইএমএফকে যুক্ত করতে হবে এই প্রকল্পে। নচেৎ বাণিজ্যিক রাজধানীর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে না। কারণ আমলারা নিজের ভবিষ্যত না দেখলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চান না। স্বাধীনতার পর থেকে তাই দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বাণিজ্যিক রাজধানী কার্যকর হবে – এটা কোনো আঞ্চলিক দাবি নয়। আশাবাদী না হলেও বলা যায়, বাংলাদেশের গনতন্ত্রের জন্য অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। এটা নীতিমালায় আনতে পারলে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে – অন্যথায়, নয়।
লেখক- শরীফ শমশির 
লেখক ও গবেষক

সর্বশেষ