শুক্রবার,১২,এপ্রিল,২০২৪
36 C
Dhaka
শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০২৪
Homeজীবন সংগ্রামনির্বাচনী হাওয়ায় চাপা পাটচাষীদের কষ্টগাঁথা

নির্বাচনী হাওয়ায় চাপা পাটচাষীদের কষ্টগাঁথা

নতুন কথা প্রতিবেদন ॥ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি আর নির্বাচনী হাওয়ায় চাপা পড়ছে দেশের লাখ লাখ পাটচাষীদের কষ্টগাঁথা। হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর অতিরিক্ত খরচের পরেও পাটচাষীদের মুখে হাসি নেই। কারণ বাজারে পাটের দাম নেই। পাট বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, খরচ’ই উঠছে না। ফলে পাট বিক্রি করে বোরো ফসল করবে, সংসারের কিছুটা অভাব মেটাবে, ছেলে-মেয়ের পোশাক কিনবে-পাটচাষীদের এমন হাজারো স্বপ্নজালে এভারো ভাটা পড়েছে।
সারাদেশে দেশে পাটচাষির সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এখাতের ওপর নির্ভিরশীল প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। কেবল তাই নয়, জিডিপিতে পাটের অবদান ০.২৬%। কৃষি খাতে পাটের একক অবদান ১.১৪%। দেশে উৎপাদিত পাটের ৫১% এখনো স্থানীয় পাটকলে ব্যবহৃত হলেও ৪৪% কাঁচা পাট বিদেশে রফতানি হয়। পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিতে দেশের ফি বছর আয় ৯০ থেকে ১শ’ কোটি ডলার। জ¦ালানি ও পার্টেক্স পণ্য তৈরিতেও পাট শলার রয়েছে অনন্য অবদান।

তারপরেও পাট ও পাটচাষীদের নিয়ে নেই কোনো পরিকল্পনা। বরং লোকসানের অজুহাতে রাষ্ট্রয়াত্ত্ব পাটকলগুলো বন্ধ করে একদিকে যেমন পাট অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে, তেমনি সীমাহীন কষ্টে আছেন পাটকল শ্রমিক পরিবার। পাটচাষীদের কষ্টও বাড়ছে। ধীরে ধীরে পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন দেশের পাটচাষীরা। এভাবে চলতে থাকলে সোনালি আঁশ খ্যাত পাটের অসিস্তত্বই একদিন বিলীন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাদেশে প্রায় ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। তার মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ হয় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। কিন্তু এবছর দক্ষিণাঞ্চল সহ সারাদেশের পাটচাষীরা’ই ভালো নেই। চলতি বছর বহুমাত্রিক সমস্যার আবর্তে বন্দি পাটচাষীদের পাটের লাভ যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পেটে। চাষীদের দুর্বলতার সুযোগে মুনাফা লুটছে পাট সিন্ডিকেট। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগ ও লোকসানে পাটচাষীরা নীরবে চোখের পানি ফেললেও তা নিয়ে গণমাধ্যমে তেমন খবর প্রকাশিত হচ্ছে না।
জানাগেছে, এবার বীজ কেনা থেকে বাজারে কাঁচা পাট বিক্রি-পাটচাষীদের ভোগান্তির সীমা নেই। পাট বোনার পর কচি চারা গজাতেই কাটুই পোকার আক্রমণ। বৈশাখ মাসে দিনোটিন কীটনাশক ছিটাতে হয়েছে স্প্রে মেশিন দিয়ে। তাতে প্রথমেই বাড়তি খরচ। সেই ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই দীর্ঘ খরার প্রভাব। যা পাটগাছের বৃদ্ধি জন্য ভালো হলেও পাট কাটা ও জাগ দেওয়ায় মহাসমস্যায় পড়তে হয়েছে। পাট জাগের জায়গা ও পানি নেই বলে খেত থেকে কাটতেই দেরি হয়েছে।

কাটতে না পেরে অনেক খেতের পাট শুকিয়ে গেছে। ডোবা, নালা, মজা পুকুর-যে যেখানে পারছেন, কোনোরকমে গাদাগাদি করে পাট ভেজানোর চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ শ্যালো মেশিন দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উঠিয়ে পুকুর, ডোবা- যেখানে পারছেন, কোনোরকমে ভর্তি করে ওখানেই পাট পচানোর ব্যবস্থা করছেন। অনেকে পুকুরের পালা মাছ আগাম বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে খরচ আরো বাড়ছে।

অনেকে প্রতি বিঘা পাটের জন্য দুই হাজার টাকা পর্যন্ত চুক্তিতে পুকুর ভাড়া নিয়ে পাট পচানোর ব্যবস্থা করছেন। যারা বেশি জমিতে পাট আবাদ করেছেন, তারা নিজের এলাকায় পাট জাগের ব্যবস্থা করতে না পারায় ভ্যানে করে তিন-চার মাইল দূরে কাঁচা পাট বয়ে নিয়ে জাগ দিচ্ছেন। আবার পাট পচার পর সেখানেই আঁশ ছাড়িয়ে একইভাবে ভ্যান ভাড়া দিয়ে বাড়িতে বয়ে এনে শুকাচ্ছেন। অমানসিক কষ্ট, কায়িক শ্রম ও দূরে জাগ দেওয়া পাটের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তো আছেই, সাথে গাঁটের পয়সাও বাড়তি খরচ হচ্ছে পাটের কারণে।
পাট হচ্ছে ভাসা পানির ফসল। কিন্তু পানির অভাবে আলকাতরার মতো পচা জলে গাদাগাদি করে পাট পচানোর ফলে পাটের রং কালচে হয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানিতে ভেজালে এমনিতেই পাটের রং নষ্ট হয়। তাই সোনালি রং আর থাকছে না।

এতকিছুর পরে বাজারে গিয়ে চাষীদের মণ আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কারণ বর্তমানে বাজারে একমণ পাট বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায়। পাটচাষীদের বক্তব্য জমি চাষ, বীজ, সার, কীটনাশক ওষুধ, নিড়ানি, টানা-বাছা, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, নোয়া ধোয়া, ভ্যানভাড়া, শুকানো-সব মিলিয়ে প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি পাট উৎপাদন হচ্ছে ৫ থেকে ৬ মণ। এতে প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষে লোকসান হচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা।

পাটের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার জন্য কেবল বিরুপ আবহাওয়াই নয়, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটও দায়ি। তাদের কাছে অসহায় পাট চাষিরা। পাট ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করায় নিতান্তই কম দামে পাট বিক্রি করতে হচ্ছে চাষিদের। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সোনালি ফসল পাটচাষ করে এখন হতাশ চাষিরা। পাটচাষে আগ্রহই হারিয়ে যাচ্ছে।
তাই পাটকেন্দ্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এবং ঐতিহ্যবাহী এ খাত রক্ষায় নতুন করে ভাবতে হবে। পাটচাষীদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই। সেই সাথে পাটকল শ্রমিক ও পাটচাষীদেরও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সংগঠিত হতে হবে। সেই আন্দোলন গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে কৃষি ও শ্রমিকবান্ধব রাজনৈতিক দল এবং গণসংগঠনসমূহকে। এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক, কৃষক ও শ্রমিক নেতাদের।

সর্বশেষ