বাংলাদেশের দারিদ্র্য বাড়ছে : বিশ্বব্যাঙ্ক: ছয় কোটির উপর মানুষ দারিদ্র্য সীমায়: টানা তিন বছর দারিদ্র্য বেড়েই চলেছে : সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই : রাজনৈতিক দলগুলোও নিশ্চুপ : নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল দরিদ্র মানুষের কোনো উপকারে আসবে কি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার স্বার্থ দেখলো!/?
সম্প্রতী এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাঙ্ক বলেছে ; শুধু এই বছরেই বিশ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেছে। এটা কোভিড-১৯ এর পরবর্তী সময়ের মতোই পরিস্থিতির মতো। এর সাথে দেখা যায় গত কয়েক বছর প্রবৃদ্ধির হারও কমেছে। ৬% থেকে ৪% এর নিচে নেমে গেছে। এর আগে ইউএনডিপি বলেছিল ২০২৫ সালে দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২১.২%- এ। ২০২৪ এ এই হার ছিল ২০.৫%। মানে হলো ২৪ সালেই তিরিশ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য সীমায় নেমে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাঙ্ক সতর্ক করে বলেছে, এতে বাংলাদেশের বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে এবং বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে। গিনি কোএফিসিয়েন্ট এ এই বৈষম্য একটা ভয়ঙ্কর জায়গায় চলে গেছে যেটার প্রভাব অর্থনীতির বাইরেও পড়বে। তাহলে দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য সমান্তরাল ভাবে বেড়ে চলেছে। তার মানে, বাংলাদেশের অর্থনীতির যা কিছু ভালো তা মুষ্টিমেয়র জন্য ভালো ; অধিকাংশ মানুষ তা থেকে বাদ পড়ে গেছে।
গত এক দশকে দেখা গেছে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের হার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ভালো ছিল। এখন পিছিয়ে গেছে। কিন্তু এখন পিছিয়ে যাচ্ছে কেনো? শুধু প্রবৃদ্ধিনির্ভর অর্থনীতি অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটালেও মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। আর রাজনীতি। রাজনীতি অর্থনীতিকে খেয়ে ফেলেছে। রাজনীতি অর্থনীতির প্রতি মনোযোগ দেয়নি। এতে দরিদ্র মানুষ অর্থনীতির মূল ভূমিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল মনোযোগ চলে গিয়েছিল রিজার্ভের স্থিতিশীলতার দিকে। এর সাথে আসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের পরামর্শ। এগুলো সামষ্টিক অর্থনীতির অঙ্ক। সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অপারগতা। এতে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফিতি বেড়ে গেছে দ্বিগুণ হারে। ফলে গরীব ও শ্রমিকদের আয় চালডালের বাজার।
এখন বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি একটা দুষ্ট চক্রে নিপতিত হয়ে গেলো। এখন কাজের সুযোগ বৃদ্ধি না হলে, মূল্যস্ফীতি না কমলে, সঞ্চয় না বাড়লে, সরকারের উন্নয়ন খাতে খরচ না বাড়লে, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ না বাড়লে, কৃষক পণ্যের ন্যায্য দাম না পেলে এবং একটা সমন্বিত দারিদ্র্য বিমোচনকে টার্গেট করে শিল্পায়ন না হলে এই দুষ্ট চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন। আর এসবের জন্য দরকার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে কাজের সুযোগ কমে আসার কারণেই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশকে এগুতে হলে শুধু ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ালেই এর সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা নির্ভর শিল্পায়নের নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে নারী কর্মীদের চাকরি কমে আসছে। আমাদের তরুণদের বেকারত্ব বেড়েছে ২.৫ হারে। নারীদের এক পঞ্চমাংশ বেকার। তারমানে শিক্ষিত ও নিরক্ষর বেকার সমান তালে বাড়ছে। প্রায় ১৮ কোটি লোকের মধ্যে ৬ কোটি লোক যদি দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যায় সেদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে। এর সমাধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব করতে পারে কিন্তু মুশকিল হলো রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষের অর্থনেতিক দূর্গতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। আর এতেই রাজনীতিতে অতীত ও বর্তমান মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে। রাজনীতিও গভীর সংকটে পড়বে। আজ হোক কাল হোক রাজনীতিকে দরিদ্র মানুষের আয়ের সুযোগকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় আনতে হবে। এনজিও কিংবা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এটাকে মীমাংসা করা যাবে না। অন্তর্বর্তীকালীন কয়েক মাস পরে হয়তো চলে যাবে কিন্তু দরিদ্র মানুষের দিকে নজর না দেওয়ার অভিযোগ থেকে তারা পার পাবেন না। দরিদ্র মানুষের উন্নয়নই বাংলাদেশের উন্নয়ন।
লেখক- শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক



