বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি : বাণিজ্যের নামে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিক্রি : বাংলাদেশের বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৃষি পণ্যের উপনিবেশে পরিণত হবে : যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদেশ তথা রাশিয়া ও চীনের সাথে পারমাণবিক ও সামরিক ক্রয়বিক্রয় করা যাবে না : যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কথিত জিএসপি সুবিধা দেওয়া হয়নি : ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ৩.৫ বিলিয়ন কৃষি পণ্য ও ১৫.৫ বিলিয়ন জ্বালানি পণ্যসহ মোট ১৮ বিলিয়ন পণ্য ক্রয় করতে হবে : বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও ফার্মের পণ্যের জন্য খুলে দিতে হবে : যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সকল পণ্য বিনা শুল্কে বাজারে প্রবেশাধিকার দিতে হবে : যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পণ্য অগ্রাধিকার দিয়ে কিনতে হবে : যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মা ও মেডিকেল পণ্য কিনতে হবে : মেধাস্বত্ব আইন অনুসরণ করতে হবে : ইপিজেডে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দিতে হবে : কাস্টমসকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল হতে হবে : অন্য দেশের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি অনুসরণ করতে হবে : যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সুবিধা মূলত রেডিমেড গার্মেন্টস পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে : যুক্তরাষ্ট্রের ন্যূনতম সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশক বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে : বাংলাদেশের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড ও সামরিক নীতিমালার বাজার- উপনিবেশে পরিণত হবে! /?
নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তথাকথিত শুল্ক ও বাণিজ্যিক চুক্তির নামে বাংলাদেশের ভবিষ্যত অর্থনীতি ও সামরিক সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিক্রি বা তুলে দিয়েছে। বিশ্লেষকগণ এই চুক্তিকে অর্থনৈতিক গোলামীর চুক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। তার ফলাফল ভোগ করতে হবে আগামী সরকার ও জনগণকে। একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে ২০১৩ সালে একটা গার্মেন্টসে আগুন লাগার পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্যের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে টিকফা বাণিজ্যিক চুক্তি, ডিজিটাল কর ব্যবস্থা, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা এবং শ্রম আইনের সংশোধনের উপর জোর দেওয়া হচ্ছিল। এইসব শর্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ এবং আইএলও সমান্তরাল ভাবে গত কয়েক বছর ধরে কাজ করে আসছিল। গত সরকার এইসব আলোচনায় অনেকটা নমনীয় হলেও টিকফার সামরিক শর্ত নিয়ে একমত হতে পারছিল না। যুক্তরাষ্ট্র তারই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক ভাবে রেজিম চেইঞ্জের জন্য পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করে। তারপর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক ও রাজনৈতিক সর্বোপরী অর্থনৈতিক চুক্তির ব্যাপারে দ্রুত এগুতে থাকে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করে তারা। এরই ফলাফল নির্বাচনের আগেই এই চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে বিজিএমইএ এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গার্মেন্টস পণ্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনেতিক ও সামরিক উপনিবেশে পরিণত করার পথ খুলে দিয়েছে।
এই চুক্তির অনেক শর্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। বাণিজ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা যাবে। ইতিমধ্যে অবশ্য তাদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। সামনের সরকারকে এই চুক্তির পায়ের খোপে খোপে হাঁটতে হবে। যাইহোক, অর্থনীতির ভাষায় একটা দেশের অর্থনীতির প্রাণ হলো তার কৃষি। তাই কোনো দেশ তার কৃষিকে অন্য দেশের পণ্যের জন্য খুলে দেয় না। এটার সাথে জড়িত কৃষক শুধু নয়, জড়িত খাদ্য সার্বভৌমত্ব, খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় সংস্কৃতির। এইসবের কোনো কিছুকে আমলে না নিয়ে চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যের অবাধ প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশেকে ভবিষ্যতে ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে হবে – কোনো সন্দেহ নেই। নন ডিসক্লোজার শর্তের অধিনে বাংলাদেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তত্বাবধানে থাকবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ চীন ও রাশিয়ার সাথে সুবিধাজনক কোনো সামরিক ও পারমাণবিক চুক্তি করতে পারবে না। বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ সরকার নিতে পারবে না, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ও অনুমোদনের উপর। যুক্তরাষ্ট্রের স্বভাব হলো তার বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রকারান্তরে তা তার সামরিক বা ভূআধিপত্যের স্বার্থ।
বাংলাদেশের সংবিধান এই ধরনের দাসত্ব মূলক চুক্তির বিরোধী। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা উপেক্ষা করেছে। প্রধান উপদেষ্টার নতুন বাংলাদেশ পরিহাসের বিষয় হলেও তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার এক নতুন বাংলাদেশ। ইতিহাস তার নিজস্ব পথে চলে, তা হলো দেশ সমূহের স্বাধীনতা। আর সাম্রাজ্যবাদী নীতির পথ হলো অন্য দেশকে বাণিজ্যের নামে, বাণিজ্যের জন্য পদানত করা। এখানে বাংলাদেশ নতি স্বীকার করেছে। আগামী দিনে বাংলাদেশ একটা শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে এগিয়ে যেতে এই চুক্তির শিকলে বাঁধা পড়তে পারে।
লেখক- শরিফ শমশির
লেখক ও গবেষক



