শনিবার,২২,জুন,২০২৪
29 C
Dhaka
শনিবার, জুন ২২, ২০২৪
Homeসীমানা পেরিয়েবোমার ঝলকানিতে রক্তলাল গাজার আকাশ

বোমার ঝলকানিতে রক্তলাল গাজার আকাশ

নতুন কথা প্রতিবেদন ॥ একদিকে বিদ্যুৎবিহীন ভুতুরে পরিবেশ, অন্যদিকে পানি ও খাদ্যের ভয়াবহ সংকট, বোমার ঝলকানিতে রক্তলাল গাজার আকাশ। বাঁচার আশায় ছুটছেন হাসপাতালে। সেখানেও কাটছেনা মৃত্যুভয়। বরং বিদ্যুতের অভাবে হাসপাতালগুলো মর্গে পরিণত হয়েছে। চারপাশে কেবল লাশ আর রক্ত। ইজরালি আগ্রাসনে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়া ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা বিশ্ববাসীর কাছে জানিয়েছেন প্রাণরক্ষার আকুতি। এমন চরম মানবিক বিপর্যয়েও দুনিয়াজুড়ে মানবতাবাদীদের অন্তর কাঁদলেও, টলছে না মানবতার ফেরিওয়ালা মার্কিনীদের মন। বাংলাদেশের মানবতা লঙ্ঘন রোধে যাদের পদক্ষেপের সীমা নেই, সেই তারাই ফিলিস্তিনের বিধ্বংসী মানবতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদ না করে উল্টো ইজরাইলি আগ্রাসনের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ জাহাজ, সমরাস্ত্র ও অস্ত্র পাঠাচ্ছে। মূলত এই অস্ত্র ব্যবসায়ীদের মুনাফা লুটের নেশার আগুন আর আধিপত্য বিস্তারের খায়েশে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য, জ্বলছে সারা দুনিয়া।
ওদের মুখে গণতন্ত্র-মানবতা, অন্তরে বিষ! বছরের পর বছর ধরে সে বিষে জ¦লেপুড়ে ছাড়খার হচ্ছে ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা। নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়েছে ইরান। আরব বিশ্বের ঐক্যের সুর’ও তাদের গলার কাঁটা। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ফায়দা না করতে পারা, আফ্রিকায় বিক্ষোভ, চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বে ব্রিকস গঠন, ল্যাটিন আমেরিকায় লাল পতাকার উত্থান, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে হাঁপিয়ে ওঠা এবং আরব দুনিয়ায় ইরানের প্রভাব বিস্তারে মার্কিনীদের রাতের ঘুম হারাম হয়েগেছে। তাই ফিলিস্তিনে ইজরাইলের হামলায় লক্ষ্য হামাস হলেও মূল টার্গেট চীন-রাশিয়া-ইরান, টার্গেট অস্ত্র ব্যবসার আধিপত্য বিস্তার এবং ভয়-ভীতি দেখিয়ে তামাম দুনিয়ায় মোড়লগিরিপনা টিকিয়ে রাখা।
এই হিংস্র অমানবিক সাম্রাজ্যবাদী অপশিক্তর কারণেই দীর্ঘ সাড়ে ৬ দশকেও ফিলিস্তিন-ইজরাইলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় নি। এদের কারণেই বছরের পর বছর জীবন দিতে হচ্ছে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুকে। বেঁচে থেকেও অনেকে জীবন্ত লাশ! গাজার মাটিতে ইজরাইলের হামলার রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই ফের বোমা-গ্রেনেডের শব্দ! রক্তের স্রোত, কান্নার আহাজারি! ইতোমধ্যে ইজরাইলি সেনাদের হামলায় ১ হাজার ৪১৭ জন ফিলিস্তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। সংঘাত-সংঘর্ষে মারা গেছেন ১ হাজার ৩০০ ইজরাইলি সামরিক-বেসামরিক নাগরিক। চলছে মহুর্মুহু বোমা হামলা। দখলদার ইসরাইলি বাহিনী গাজায় খাদ্য, ওষুধ এবং পানিসহ বেঁচে থাকার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো কিছুই প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এই উপত্যকার লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে থাকেন আন্তর্জাতিক খাদ্য সহায়তার উপর নির্ভর করে। ইজরাইলের অবরুদ্ধ গাজার বাসিন্দারা তা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ১১ লাখ গাজাবাসীকে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে ইজরাইলের সামরিক বাহিনী।
বলা হচ্ছে, হামাস আগে আক্রমণ করেছে। তাদেরকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। এই আমেরিকাই বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন মাতৃভূমি রক্ষার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, তখন তাদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ অ্যাখ্যা দিয়ে তা দমনে সপ্তম রণতরী পাঠিয়েছিল। একইভাবে ফিলিস্তিনের বীর জনতা যখন তাদের মাতৃভূমি রক্ষায় প্রতিরোধ লড়াইয়ে নেমেছেন, তাদেরকেও সন্ত্রাসবাদী বলে যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদীদের সুরে তাল মিলিয়ে অনেকেই হামাসকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ অপবাদের চেষ্টা করছে। কিন্তু মাতৃভূমি পুনরুদ্ধারে এছাড়া তাদের আর কী’ই বা করার আছে। ‘বেলফোর’ ঘোষণার মাধ্যমে ইউরোপ থেকে বিতাড়িত যে ইহুদিরা আরব ভূমিতে আশ্রয় নিয়েছিল, আজ তারাই ফিলিস্তিনিদের বিষফোঁড়া। নিজভূমে তারাই আজ পরবাসী। যেখানে তাদের আবাস, তাদের নিজস্ব ভূমি, সেখানেই আজ তারা খোলা আকাশের নিচে অবরুদ্ধ জেলখানার বাসিন্দা। ইজরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োভা গ্যালান্টের মন্তব্য অনুযায়ী সত্যি’ই গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষ ‘পশু’র মতো জীবনযাপন করছেন। স্বদেশের কোথাও যেতে পারেন না, চলতে হয় ইজরাইলি সেনাদের নির্দেশ মতো। বিদ্যুৎ আসে ইজরায়েলের খেয়ালখুশিতে, পান করতে হয় অনিরাপদ পানি। নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে তাদের বাস করতে হয় শরণার্থী হিসেবে। বেঁচে থাকতে হয় আন্তর্জাতিক খাদ্য সহায়তায়। তাও বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ’৪৮-এ যে যেটুকু মানচিত্র ছিল, এখন তাও নেই। এখানেই শেষ নয়, দৈনন্দিন জীবন চালাতে হয় বোমা, গুলি, বিমান, রকেট, ড্রোন হামলার মধ্যে। ছোট্র শিশু জানেনা কতদিন তার বাবা-মায়ের আদর পাবে! ফিলিস্তিন-ইজরাইয়েল সংঘর্ষের অনেক আগেই ফিলিস্তিনিদের উদ্যেশ্যে ইজরাইয়েলের অর্থমন্ত্রী বলেছিল, “তিনটি বিকল্প, অন্য দেশে চলে যাও, থাকতে চাইলে ইজরাইলের অধীনে থাকো, অথবা মরো।” নিজের দেশে এমন মানবেতর জীবন আর মৃত্যু ভয় থেকে রক্ষা পেতে কে না ঘুরে দাঁড়াতে চায়? ফিলিস্তিনের বীর জনতাও তাই করছে। ফলে ইজরাইল ও মার্কিনীদের চোখে হামাস সন্ত্রাসবাদী হলেও বিশ্বের মানবতাবাদীদের কাছে হামাস এবং ফিলিস্তিনিরা সন্ত্রাসবাদী নয়, মাতৃভূমি রক্ষার রিয়াল হিরো।
দুনিয়ার সকল মানবতাবাদী রাষ্ট্র ও সংগঠনগুলোর ফিলিস্তিনিদের মুক্তির সংগ্রামে পাশে দাঁড়ানো উচিৎ। ইতোমধ্যে ইরান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেছে। সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে মালয়েশিয়া। আশার কথা হলো মার্কিনীদের মধ্যপ্রাচ্যে ইজরাইয়েলের পর বন্ধু খ্যাত সৌদি আরবও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে মুখ খুলেছে। এই প্রথম ফিলিস্তিন ইস্যুতে টেলিফোন আলাপ হয়েছে তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, দুই দেশের নেতা ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন চলমান উত্তেজনা প্রশমনে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করছে সৌদি আরব। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়, একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা, তাদের আশা-আকাক্সক্ষা উপলব্ধি করা এবং একটি ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি অর্জনে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানো অব্যাহত রাখবে সৌদি আরব। স্বপক্ষে কথা বলেছে রাশিয়াও। গাজার বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘মানবিক করিডোর’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নেতারা। বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক চিত্র। ফুরিয়ে আসছে মানবাধিকারের কথা বলে মুখে ফেনা তোলা মার্কিনীদের দিন! ফিরে আসুক ফিলিস্তিনের বীর জনতার সুদিন-প্রত্যাশা বিশ্ব মানবতাবাদী রাষ্ট্র ও মানুষের।

সর্বশেষ