৯ সেপ্টেম্বর মাও সেতুং এর প্রয়াণ দিবস। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা, গেরিলা সংগঠক, চীনা বিপ্লবী, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও এক অবিসংবাদিত রাজনৈতিক নেতা। ইতিহাসের চাকা বারবার বদলে দিয়েছেন চৈনিক এই মানুষটি। তিনি শ্রমিকের বদলে কৃষককে চিহ্নিত করেছেন বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে, গড়ে তুলেছেন সশস্ত্র রেড আর্মি, প্রচলন করেছেন আরণ্যক গেরিলা যুদ্ধের। বিশ্বময় তরুণরদের আজও আগ্রহ মাও সেতুং।
একনজরে মাও সেতুং
জন্ম : ২৬
ডিসেম্বর ১৮৯৩
জন্মস্থান : হুনান প্রদেশ, শাওশান গ্রাম
মৃত্যু : ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ (৮২ বছর)
মৃত্যু স্থান : বেইজিং
রাজনৈতিক দল : চীনের কমিউনিস্ট পার্টি
পেশা : বিপ্লবী, রাষ্ট্রনায়ক
প্রবক্তা : মাওবাদ ও লং মার্চ
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
কর্মের মাধ্যমেই একটি মানুষের জন্মের সার্থকতা বা ব্যর্থতার পরিচয়। কিছু কিছু জন্ম সার্থক হয়ে গড়ে ওঠে সত্তা হিসেবে, যা তার মৃত্যুকেও ছাপিয়ে তার ব্যাপ্তিকে পৌঁছে দেয় এক নতুন উচ্চতায়। এমনই এক সত্তা গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং। মার্কসবাদ-লেনিনবাদে তার তাত্ত্বিক অবদান।
সমর কৌশল এবং তার কমিউনিজমের নীতি এখন একত্রে মাওবাদ নামে পরিচিত। মাও ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে ২৪ বছর বয়সে রাজধানী পিকিংয়ে গমন এবং মার্কস তত্ত্বের আলোকে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও নিজ প্রচেষ্টায় তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যানের শীর্ষ পদে পৌঁছতে পেরেছিলেন এবং সফলভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্যায় কেটেছে তাঁর নিজ প্রদেশ হুনানে। ১৯১৭-১৯ সালে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে কিছুদিন কাজ করার সময়টুকু বাদ দিয়ে, এখানে তিনি বিভিন্ন সমিতি ও পত্রিকার মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ-এর বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম শুরু করেন। তাঁর এই কাজ বহু ছাত্র ও তরুণ বুদ্ধিজীবীকে অনুপ্রাণিত করে। অপর দিকে তিনি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্তরেও অত্যাচারী শোষক শ্রেণীগুলির বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করেন। এই দুই ধরনের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে হুনান প্রদেশের প্রথম কমিউনিস্ট গ্রুপগুলি গড়ে তোলেন। চীনের বিভিন্ন প্রদেশে এই ধরনের কয়েকটি গ্রুপের ১২ জন প্রতিনিধি ১৯২১ সালে মিলিত হন ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। মাও সেতুং সেই ১২ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে ছিলেন। দুই বৎসরের মধ্যেই তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি এই পার্টির রাজনৈতিক, আদর্শগত ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। পার্টির নেতা হিসাবে প্রথম থেকেই মাও সেতুং আদর্শগত কাজকর্ম কমিউনিস্ট শিক্ষা ও ক্যাডার গড়ে তোলার কাজের ওপর গুরুত্ব দেন।
১৯১১ সালে চীনের কিঙ রাজতন্ত্রের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে শুরু হয় জাতীয়তাবাদীদের তীব্র গণআন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম নেতা সান ইয়াত সেনের সঙ্গে যোগ দেন মাও সেতুং। আন্দোলনে জয়ের পর গঠিত হয় কউমিঙটাঙ (জাতীয়তাবাদী) দল। ১৯১৮ সালে মাও সে তুং চীনের বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে চাকরি শুরু করেন। সে সময় বামপন্থি এক বুদ্ধিজীবীর চিন্তাধারায় মাও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। এছাড়া কাজের অবসরে তিনি পাঠ করতে শুরু করেন সভ্যতার বিস্ময়কর এক তত্ত্ব মাকর্সবাদ। তখনই বুঝতে পারলেন মায়ের ‘বুদ্ধবাদ’ ও বাবার ‘কনফুসিয়বাদ’ কোনো কাজের জিনিস না।
তরুণ বয়স থেকেই মাও বামপন্থি রাজনৈতিক ধ্যানধারণার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯১৯ সালে চীনকে আধুনিকায়ন করার লক্ষে চীনের বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে একটি আন্দোলন চলছিল। সে আন্দোলনে মাও সেতুং-ও যোগ দিয়েছিলেন তার লেখনীর মাধ্যমে। ১৯২০ সালের দিকে তিনি একজন মার্কসবাদী হিসেবে চীনা রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। ওই বছরেই চীনের চাংশায় ফিরে যান মাও। হুনান প্রদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য মাও উদ্যোগী হলেও তা ব্যর্থ হয়েছিল।
এদিকে হুনান প্রদেশের কৃষকদের নিয়ে সৈন্যবাহিনী গঠন করেন মাও। এই বাহিনী নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিলেও পরাজিত হন তিনি। এরপর চীনের দক্ষিণের পার্বত্য এলাকা জিয়াংজি প্রদেশে চলে যান মাও। এ সময়ে অসংখ্য তরুণ দলে দলে মাও নিয়ন্ত্রিত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে শুরু করে। মাও সেতুং তাদের সশস্ত্র সংগঠিত করেন। ইতিহাসে এই সশস্ত্র দলটি রেড আর্মি নামে পরিচিতি পায়। এদের লক্ষ ছিল কৃষকের মুক্তি। আর সে লক্ষ অর্জনে অভিনব গেরিলা যুদ্ধের পথ অনুসরণ করে এ দল। ১৯৩৪ সালে চিয়াং কাই শেক চীনের জিয়াংজি প্রদেশ ঘিরে ফেলে। তবে বিস্ময়কর ও অপ্রতিরোধ্য গতিবেগে সে বেড়াজাল ছিন্ন করে রেড আর্মিকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন মাও সেতুং।
এর পর তিনি শুরু করেন এক দীর্ঘ পদযাত্রা। যা ইতিহাসে লং মার্চ হিসেবে পরিচিত। চীনের উত্তরের ইয়ানান প্রদেশের উদ্দেশ্যে রেড আর্মির সঙ্গে ছয় হাজার মাইল দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে শুরু হয় এই পদযাত্রা।
১৯৩৭ সালে চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হলে পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাই শেকের ন্যাশনাল পার্টি এবং মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি একত্রিত হয়ে আগ্রাসী জাপানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে ১৯৪৫ সালে জাপান পরাজিত হয়। তারপর শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এ গৃহযুদ্ধে জয়ী কমিউনিস্ট পার্টি মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনের বিশাল ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর বিজয়ী কমিউনিস্ট মুক্তিফৌজের অগ্রগামী অংশ ক্যান্টনে প্রবেশ করলে চিয়াং কাই শেক সদলবলে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে পালিয়ে ফরমোজা দ্বীপে আশ্রয় নেন। স্বৈরশাসক কাই শেককে পরাস্ত করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন মাও। ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মাও স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদে বহাল থাকেন।
মাও সেতুংয়ের সবচেয়ে বড় অবদান তিনি চীনে শিল্প ও কৃষিতে বিপ্লব সাধন করেন এবং সমাজতান্ত্রিক গণচীনের ভিত্তি সুদৃঢ় করার জন্য প্রথম সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত করেন। বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ ভাগে এসে মাও সেতুং বেশ দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। জীবনের শেষ ছয় মাস তাকে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এই অবিসংবাদিত মহান নেতা ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাকে বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে তার সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ‘মাও সেতুং স্মৃতিসৌধ’। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের আজকের উত্থানের কারিগর কমরেড মাও সেতুং লাল সালাম।



