প্রচ্ছদসম্পাদকীয়মুক্তমতমাইকেল প্যারেন্টি: আমেরিকান মার্কসবাদীর মহৎ প্রয়ান

মাইকেল প্যারেন্টি: আমেরিকান মার্কসবাদীর মহৎ প্রয়ান

মাইকেল প্যারেন্টি (১৯৩৩-২০২৬):  আমেরিকান মার্কসবাদীর মহৎ প্রয়ান: সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পর্যালোচক: সোভিয়েত পরবর্তী গণতান্ত্রিক রাজনীতির সমালোচক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বরুপ উন্মোচক: আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণির অধিকার বিষয়ে সোচ্চার : আমেরিকান মার্কসবাদের বৈশিষ্ট্য তিনি ধারণ করেন: প্রথাগত মার্কসবাদের বিপরীতে সোভিয়েত পরবর্তী মার্কসবাদের একজন তাত্ত্বিক : তাঁর প্রয়াণে গভীর শ্রদ্ধা : তাঁর চিন্তার উত্তরাধিকার ক্রমপ্রসারমান :
২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ এ নব্বই উর্ধ আমেরিকান মার্কসবাদী লেখক মাইকেল প্যারেন্টি প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুতে একজন খ্যাতিমান বামপন্থী লেখক ও বিশ্লেষকের জীবনের অবসান হয়েছে। এটা একটা শূন্যতা তৈরি করবে। তাঁর মতো এত দৃঢ়তার সাথে কে আর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতির স্বরূপ উন্মোচন করবে! আমেরিকান মার্কসবাদ কি? এই জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর মাইকেল প্যারেন্টি। বিংশ শতকের একটু আগে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রে মার্কস ইউরোপে বসে কলাম লিখতেন। মার্কসের সভাপতিত্বে প্রথম আন্তর্জাতিকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষের সংগঠনের প্রধান অফিস ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার । তখন ইউরোপের ভাগ্যান্বেষী শ্রমজীবী মানুষ পঙ্গপালের মতো যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছিল। ইউরোপে সেই সময় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী আকাঙ্খাও বেশ পরিপক্ব হচ্ছিল। বিপ্লবের জন্য মার্কস ও এঙ্গেলসের মতো ক্ষুরধার কমিউনিস্ট লেখক একটা তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করে ফেলেছেন। পুঁজিবাদের মূল পুঁজির বিকাশ ও দ্বন্দ্ব বা সংকট সম্পর্কে মার্কস পুঁজি গ্রন্থে একটা যুগান্তকারী ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতি ও রাষ্ট্র- সমাজ কেমন হবে তারও একটা কাঠামোর কথা বলেছেন। একদিকে ইউরোপ কমিউনিজমের ভূত দেখছে অন্য দিকে শ্রমজীবী মানুষ শৃঙ্খল ভেঙে বিশ্ব জয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মার্কস আশা করছিলে শ্রমজীবীদের নতুন ঠিকানা যেমন যুক্তরাষ্ট্র হবে তেমনি শ্রমজীবীদের নতুন সম্ভাবনাও সেখানে হবে। যদিও ইউরোপের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও মার্কসের আশাবাদী মন্তব্য খুব বেশি ফলদায়ক হয়নি কারণ ততদিনে পুঁজিবাদীরাও নতুন নতুন উৎপাদন উপকরণের উদ্ভাবন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। আর এর ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মূলনীতিতে গণতন্ত্র থাকলেও কমিউনিজম নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তাই ১৯২০ সালের পর আমেরিকায় কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়েছিল কিন্তু তাদের সংবিধান মেনে সমাজতন্ত্রের কথা বলতে হতো। অন্য দিকে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আরও সতর্ক হয় এবং কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রীদের উপর খড়গহস্ত হয়ে উঠে। তাই আমেরিকার মার্কসবাদী বা সমাজতন্ত্রীদের সরকারি দমন-পীড়নের মাঝে নতুন ভাষা বা তাদের মতো করে বিপ্লবী ন্যারেটিভ তৈরি করতে হয়। আমেরিকার বিপ্লবী সাহিত্যও তাই আমেরিকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।
যাইহোক, এই প্রবেশিকা দিতে হলো মাইকেল প্যারেন্টির ভাষা ও ব্যাখ্যা অনুধাবন করার জন্য। প্যারেন্টির বইয়ের তালিকা দেখলে তা অনুভব করা যাবে। প্যারেন্টির সাম্রাজ্যের বিপরীতে বইটা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বেশি পরিচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে ব্লাকশার্টস এন্ড রেডস ইত্যাদি বেশি পরিচিত এবং পঠিত। প্যারেন্টি একজন বক্তা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অনেকটা ব্রাত্য ছিলেন কারণ যুক্তরাষ্ট্রের
ইউনিভার্সিটিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং বামপন্থী মতকে গলা টিপে দেয়। প্যারেন্টির চিন্তা সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে সমাজতন্ত্রের পর্যালোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমজীবীদের শোষণের স্বরূপ উন্মোচনে সীমাবদ্ধ ছিল। নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসানের পর যুক্তরাষ্ট্রের একক শক্তির উন্মেষ ও বিকাশের কালে তাঁর লেখার বিষয়বস্তু বদলে যায়।  এসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের স্বরূপ যেমন ব্যখ্যা করার দিকে মনোযোগ দেন তেমনি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের নৃশংসতা তিনি তুলে ধরেছেন।  যুগোস্লাভিয়ার বিভক্তিকে কেন্দ্র যে নৃশংস রায়ট বা গণহত্যা হয়েছিল তার ব্যাখ্যা করে তিনি দেখালেন গনতন্ত্র আসলে পুঁজিপতি এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি একইসাথে দেখালেন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বাস্তবায়নে বড় হাতিয়ার হলো, মিডিয়া এবং সামরিক হস্তক্ষেপ বা অভিযান। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর বুনিয়াদ হলো পুঁজিপতি, মিডিয়া এবং সামরিক কারখানার মালিকদের জোট।
মাইকেল প্যারেন্টি গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সফলতা হলো সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, খাদ্য এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন। এটা গত চারশো বছরের অধিক সময়ে পুঁজিবাদী দেশগুলো এত সম্পদ সত্ত্বেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অন্য দিকে সোভিয়েতপরবর্তীতে গনতন্ত্রের নামে যা হয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের বা পুঁজিবাদী বিশ্বের আধিপত্য ছাড়া আর কিছু নয়। মাইকেল প্যারেন্টি সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের এই পার্থক্য যে মুন্সিয়ানার সাথে তুলে ধরেছেন তা অন্যদের লেখায় তেমন পাওয়া যায় না।
এখন এককেন্দ্রিক বিশ্বে গনতন্ত্রের নামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ অনেক বেশি প্রত্যক্ষ এবং নগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের গনতন্ত্রের মিষ্টি ভাষা এবং আশায় দেশে দেশে বামপন্থীরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়। আর তাদের ভ্রম কাটতে কাটতে শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতি ও অধিকারের ক্ষতি হয়ে যায়। মাইকেল প্যারেন্টির গুরুত্ব এখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের স্বরূপ যেমন উন্মোচন করে দেন তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য দেশে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাম্রাজ্যবাদী কৌশলও ফাঁস করে দেন। অনেক আলোচনা সমালোচনা আছে তবুও মাইকেল প্যারেন্টির আলোচনা মুক্তির জন্য চোখ খুলে দেয়। তাঁর মৃত্যু বামপন্থী চিন্তার এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক- শরীফ শমশির 
লেখক ও গবেষক

সর্বশেষ