রবিবার,২৫,ফেব্রুয়ারি,২০২৪
20 C
Dhaka
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪
Homeজীবন সংগ্রামমুনাফাখোরদের কাছে সরকার অসহায় কেনো?

মুনাফাখোরদের কাছে সরকার অসহায় কেনো?

নতুন কথা প্রতিবেদন ॥ সুবিধাবাদী, মুনাফাখোরদের কাছে অসহায় দেশের ক্রেতা-ভোক্তারা। শুধু তাই নয় অসহায় সরকারও। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা আমদানির মাধ্যমে দামের ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারনে সে চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আরো বেপরোয়া ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারার দল’। তাদের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে না যেতে পারার কথাগুলো বিভিন্ন সময়ে বেরিয়ে আসছে মন্ত্রীদের কথাবার্তায়।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০ সেপ্টেম্বও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রংপুর মহানগরীর উত্তম এলাকার আরমান কোল্ডস্টোরেজে অভিযান চালায়। সকাল ৯টা বাজতেই উপস্থিতি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তিনি ডেকে পাঠান, স্টোরেজের ম্যানেজার রেজাউল এবং রাসেল নামের অপর এক ব্যবসায়ীকে। তাদের বিলম্ব দেখে পুলিশ পাঠালে ঘটনাস্থলে আসেন দু’জন। কাগজ-পত্র ঘেটে দেখা যায়, এ মৌসুমে আরমান কোল্ডস্টোরেজে আলু মজুদ করা হয়, দুই লাখ ১০ বস্তা। মৌসুম প্রায় শেষ হয়ে গেলেও মজুদের পরিমাণ এক লাখ বস্তার বেশি। মানে, বেশি দামের আশায় আলু বিক্রি করেননি তারা। এরপরের তথ্য আরো উদ্বেগের। এই কোল্ডস্টোরেজে আলু মজুদের জন্য চার কোটি ৬০ লাখ টাকা, দাদনের মতো করে দেয়া হয় কৃষকদের। এই টাকা পূবালী ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল অন্য ব্যবসার কথা বলে! এই প্রক্রিয়ার মূল কারিগর ছিলেন, ব্যবসায়ী রাসেল। একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, প্রায় এক বছর আগে আলু থেকে বিশাল মুনাফার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
সব দেখে-শুনে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, আলু বের করে ২৭ টাকা দরে বিক্রির ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দেন, জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকে। পুলিশে সোপর্দ করা হয়, রেজাউল ও রাসেলকে। কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ ছাড়া পেয়ে যান দুইজন। জানা যায়, ওই ২০ তারিখ পর্যন্ত রংপুর বিভাগের আটটি জেলার ১০৬টি কোল্ড স্টোরেজে আলুর মজুদ ছিল প্রায় পাঁচ লাখ টন।
এ ঘটনার আগে ১৪ সেপ্টেম্বর আলু, ডিম, পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে আলুর দাম হবে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। প্রতি পিস ডিম বিক্রি হবে ১২ টাকা। আর দেশি পেঁয়াজের বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়, প্রতি কেজি ৭০-৮০ টাকা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের বেধে দেওয়া দামে পণ্য মেলেনি বাজারে। অথচ এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল কৃষি এবং মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে। তারা উৎপাদন খরচ, পরিবহণ, পাইকারি-খুচরা পর্যায়ে মুনাফাসহ সবকিছু বিবেচনা করে দর নির্ধারণ করেছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে গলদ কোথায়? আর উত্তরণের রাস্তাইবা কোন দিকে?
কয়েক মাস আগে কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে গেলে, ভারত থেকে আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রেও ডিম, আলু আমদানি করে বাজারে দামের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। আমদানির প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। সিদ্ধান্ত নিতেই কেটে যায় কয়েক দিন। ডিমের ক্ষেত্রে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে সময় গেছে। আমদানির অনুমতি দেওয়ার পর ডিম দেশে আসতে লেগেছে ৪৯ দিন। আলু আনার অনুমতি দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে দেশে এসে যায়।

বাংলাদেশ ডিম-আলু আমদানিতে অভ্যস্ত নয়। বরং আলু রপ্ত ানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেয় সরকার। এই ডিম-আলু আমদানির চেয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে আর বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি দূর করে, দাম সহনীয় রাখাটাই প্রত্যাশিত। বাজার ব্যবস্থাপনা ত্রুটি রংপুরের আরমান কোল্ড স্টোরেজের ঘটনায় স্পষ্ট। আমরা এটাকে যদি কেইস স্টাডি হিসেবে ধরি, তাহলে মন্ত্রীদের কথায় সামগ্রিক চিত্র দেখতে পাব।
৩০ অক্টোব কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, কোল্ডস্টোরেজ মালিকরা একটি সিন্ডিকেট করে আলুর দাম বাড়াচ্ছেন। এ বছর অস্বাভাবিকভাবে আলুর দাম বেড়েছে। আমরা যে দাম স্থির করে দিয়েছিলাম, তাতেও তাদের (কোল্ডস্টোরেজ) লাভ থাকার কথা। কিন্তু সেই দামের ধারে কাছেও থাকছেন না তারা। কোল্ডস্টোরেজ মালিকরা আলু বের করেন না, লুকিয়ে রাখেন। সেদিনই বাণিজ্যমন্ত্রণালয়ের অনুরোধে আলু আমদানির সিদ্ধান্তের কথা জানান ড. রাজ্জাক।
এর আগে জুনে দ্রব্যমূল্য নিয়ে সংসদে বিরোধী এমপিদের কড়া সমালোচনার জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, বড় গ্রুপগুলোকে জেল-জরিমানা করা যায়। কিন্তু তাতে হঠাৎ যে সংকট তৈরি হবে, তা সইতে কষ্ট হবে।
শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ে একটি ছায়া সংসদ বিতর্কে বলেছেন, ‘করপোরেটরা নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু। একেবারে মিডিয়াসহ, সাংবাদিক, আমরাতো আছিই। কাউকে বাদ দেয় না তারা। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা খুব কষ্টকর। যেহেতু নির্বাচন সামনে সরকারও বেকায়দা আছে। এ সুযোগটাই আমার মনে হয় নিচ্ছে।
মন্ত্রীদের এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বাজার ভোক্তারা পণ্য কিনে ঠকছেন। অন্য দিকে লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়িরা। কিন্তু সরকার তাদের কিছু করতে পারছে না।

সর্বশেষ