29 C
Dhaka
বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

অনলাইন টিভি

Bangladesh
2,024,489
কোভিড-১৯ সর্বমোট আক্রান্ত
Updated on September 29, 2022 11:38 PM
Homeসীমানা পেরিয়েযুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় রাশিয়ার ভরসা চীন

যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় রাশিয়ার ভরসা চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥ ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে একঘরে করার পরিকল্পনায় এগোচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করতে চাচ্ছে। রাশিয়ার ওপর প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এতে মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রভাব বাড়বে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা কোনোমতেই বাস্তবায়ন হতে দেবে না রাশিয়া। মস্কো বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বলে আসছে ইউক্রেনকে যেন ন্যাটোর সদস্য পদ না দেওয়া হয়। আর ইউক্রেনকেও বলে দেওয়া হয়েছে পশ্চিমাদের পাতা ফাঁদে পা দিলে দেশটির চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য দিবেই। এ এনিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চরম রেষারোষি চলছে। কিছুদিন আগে রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে। পাঠিয়েছে যুদ্ধাস্ত্র। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। ইউক্রেনে হামলা হতে পারে এই আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র পাঠিয়েছে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনকে পাশে পেতে চাইছে রাশিয়া। কারণ ইউক্রেনে পশ্চিমা প্রভাব বাড়লে চীনও হুমকিতে পড়বে। এরপর তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সঙ্গেও এ ধরনের আচরণ শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র।
তাই অভিন্ন শত্রু যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলায় রাশিয়া ও চীন ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। দুই দেশ সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাড়াছে ব্যবসা-বাণিজ্য। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যে ক্ষতি করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র তা পুষিয়ে দিচ্ছে চীন। রাশিয়া থেকে গ্যাস, অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র আনছে চীন। দুই দেশের ঘনিষ্টতা এখন এতোটাই যে গত আট বছরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ৩৮ বার বৈঠক করেছেন।

নিষেধাজ্ঞায় ভরসা কেন চীন? : ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রাইমিয়া নিয়ে নেওয়ার পর আমেরিকা এবং পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়। সে সময় প্রেসিডেন্ট পুতিন চীনের দিকে তাকিয়েছিলেন এবং সাড়া পেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেইজিং শুধু তেল এবং গ্যাস কেনা নিয়েই মস্কোর মঙ্গে চারশো’ বিলিয়ন ডলারের (৪০,০০০ কোটি ডলার) চুক্তি সই করে, যা সে সময়ে রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ভরাডুবি থেকে থেকে বাঁচিয়েছিল।

অভিন্ন শত্রু আমেরিকা : স্ট্যালিন এবং মাও সে তুং-এর পর দুই দেশের মধ্যে এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কখনই হয়নি এবং এর পেছনে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশের রেষারেষি। দুই দেশই দেখেছে তাদের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা নীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্র। এই অভিন্ন শত্রুকে মোকাবেলার কৌশল হিসাবে ঐক্যের তাড়না থেকে ব্যবসা-অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক গত বছরগুলোতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে।
চীন এখন রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান ক্রেতা, আধুনিক অস্ত্রেরও বড় ক্রেতা। রাশিয়ার রপ্তানি আয়ের ২৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৫ সালে ছিল ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সাল থেকে পাইপলাইন দিয়ে চীনে রাশিয়ার গ্যাস যাচ্ছে। দ্বিতীয় আরেকটি পাইপলাইন বসানোর চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

পুতিন-শি ঘনিষ্ঠতা : রাশিয়া আর চীনের নেতারা তাদের সম্পর্ক নিয়ে তাদের আবেগ প্রকাশে কোনো দ্বিধা করেন না। চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী কূটনীতিক ইয়াং জিয়েচি সম্প্রতি রুশ-চীন সম্পর্ককে ‘ইতিহাসের সর্বোত্তম’ বলে বর্ণনা করেছেন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এই সম্পর্ককে ‘২১ শতকের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার একটি মডেল’ বলে মন্তব্য করেছেন। শি জিন পিং রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে তার ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ সম্বোধন করেন। পুতিনও চীনের প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তারে মতে, চীনা নেতা একজন ‘অত্যন্ত মেধাবী’ বিশ্বনেতা। দুই প্রেসিডেন্ট নিয়মিত নিজেদের মধ্যে কখনো মুখোমুখি আবার কখনো ভিডিও কনফারেন্সে ৩৮ বার কথা বলেছেন।

চীনের নিজের স্বার্থ : অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, শুধু সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বা রাশিয়ার চাওয়া নয়, ইউক্রেন ইস্যুতে পুতিনের পক্ষ নিয়ে আমেরিকাকে কোণঠাসা করার পেছনে চীনের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ক্রিস মিলার বলেন, ইউক্রেন নিয়ে আমেরিকার আপোষহীন অবস্থান দেখে চীন তাইওয়ান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
তিনি মনে করেন, ইউক্রেনের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তারপরও ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়র যুদ্ধ বাধলে চুপ করে থাকা চীনের জন্য এ দফায় শক্ত হবে। চীন রাশিয়ার পাশেই দাঁড়াবে।
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং ই কিছুদিন আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করে বলেছেন যে, ‘পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগ যথার্থ এবং তাকে বিবেচনা করতে হবে।’
খুব শক্ত কথা এখনো চীন বলেনি, তবে গবেষণা সংস্থা কার্নেগির মস্কো সেন্টারের গবেষক আলেকজান্ডার গাবুয়েভকে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ইউক্রেন নিয়ে সৃষ্ট টানাপোড়েনে চীনের গভীর স্বার্থ জড়িয়ে আছে, এবং চীন সময় ও সুযোগ মত তৎপর হবে।
গাবুয়েভের মতে, দুই দিক থেকে চীনের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। প্রথমত: ইউরোপে কোনো বড় সংকট তৈরি হলে আমেরিকা সেখানে এতটাই জড়িয়ে পড়বে যে চীনকে কোণঠাসা করার দিকে নজর রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আর দ্বিতীয় লাভটি হচ্ছে, রাশিয়া চীনের আরো কাছাকাছি চলে আসতে বাধ্য হবে এবং চীনের শর্ত মেনেই তাদের আসতে হবে।

তবে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বিশ্ব ব্যবস্থায় আমেরিকান প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল হিসাবে ১৯৯৬ সাল থেকে চীন এবং রাশিয়া একটি অভিন্ন প্লাটফর্ম তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। ১৯৯৬ থেকে পরের কয়েক বছরে চীন ও রাশিয়া তাদের সীমান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করে ফেলে। ২০০১ সালে তারা একটি মৈত্রী চুক্তি করে। তার ওপর ভিত্তি করে দুই দেশ কৌশলগত সম্পর্কের কিছু কাঠামো তৈরি করে ফেলেছে। সাংহাই কোয়াপরেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) তেমন একটি প্রতিষ্ঠান।
নিজেদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে-যেমন ইরান, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া-দুই দেশ এখন অভিন্ন সুরে কথা বলছে। আমেরিকার তোয়াক্কা না করে ইরানকে গত বছর এসসিওর পূর্ণ সদস্য করা হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি কাজাখস্তানে রুশ সৈন্য মোতায়েনকে সমর্থন করেছে চীন।
গত ডিসেম্বর মাসে পুতিন ও শি’র ভার্চুয়াল বৈঠকে এই দুই রাষ্ট্রপ্রধান আমেরিকা ও ডলারের প্রাধান্যহীন একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার ওপর আমেরিকার নতুন করে নিষেধাজ্ঞা কিংবা রাশিয়াকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার আমেরিকার নীতি কার্যকর হবে না।

সর্বশেষ