28 C
Dhaka
শনিবার, মে ১৫, ২০২১

অনলাইন টিভি

Bangladesh
779,535
কোভিড-১৯ সর্বমোট আক্রান্ত
Updated on May 15, 2021 4:51 AM
Homeশিক্ষা সংস্কৃতিলোক সাহিত্যশিল্প ও সাহিত্যঃ মার্কসীয় বিচার

শিল্প ও সাহিত্যঃ মার্কসীয় বিচার

।। শরীফ শমশির ।।

বৃহৎ অর্থে বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চায় ‘অপসংস্কৃতি’ নামক শব্দটিও বহুলভাবে চর্চিত হয়। পন্ডিতগণ  সংস্কৃতির আলোচনায় যেমন একমত নন তেমনি অপসংস্কৃতির সংজ্ঞা নির্মাণেও ঐক্যবদ্ধ নন। কারণ বাস্তব জীবনে অনুশীলন দিয়ে অর্জিত জ্ঞানবৃদ্ধির উৎকর্ষ সাধনের ক্ষেত্রে অর্থাৎ সংস্কৃতি চর্চায় অনেক উৎপন্নের সাথে উপজাতও থাকে। সংস্কৃতি চর্চাকে অনেকেই একান্তই মননশীল এবং অপসংস্কৃতিকে তার বিকৃতি মনে করেন। এই ধারণা সংস্কৃতির সকল শাখায় যেমন চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, ভাস্কর্য সাহিত্যসহ মায় চলচিত্র পর্যন্ত ব্যাপ্ত। এসব ধারণা বা প্রতীতি কোথা থেকে আসে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, নৃতত্ত¡ ইত্যাদি ঘাটতে হয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর কথাও অনেকেই বলেন। আর এইসবই হলো বিচার। বর্তমান বিশ্বে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বা বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে মার্কসীয় বিচার একটি গুরুত্বপুর্ণ ধারা। এই বিচার পদ্ধতিগতভাবে ঐতিহাসিক ও বস্তুতান্ত্রিক।

কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিক এঙ্গেলস এবং লেনিনের নামে এই দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে ওঠলেও কডওয়েল, লুকাস আলথুসারসহ অনেক পÐিত এ ধারণাকে আরো বিস্তৃত করেছেন। বাংলা সংস্কৃতি চর্চায়ও এ ধারণা বিকাশের বয়স শত বর্ষের ওপর। বিপ্লবী বা স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ারের সময় এই মত ও পথের সরব উপস্থিতি দেখা যায় এবং    প্রতি-বিপ্লব বা প্রতিক্রিয়াশীল কালে এর ভাটা দেখা যায়। বাংলাদেশে এখন এই মত ও পথের ভাটা চলছে কারণ সমাজে এখন বিদ্রোহ-বিপ্লব- আলোড়ন তেমন নেই। এখন সমাজে-রাষ্ট্রে-অর্থনীতি-সংস্কৃতিতে নয়া উদারবাদী প্রভাব চলছে। এই প্রভাবের গতি এখন প্রবল। কিন্তু এ অবস্থায়ও সংস্কৃতির রূপ-কাঠামোর পরিবর্তন অনুধাবনের জন্য মার্কসীয় বিচার কার্যকর বলে আমি মনে করি। তদুপরি সমাজে, শিল্পে-সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে আলোড়ন তৈরির জন্যও মার্কসীয় বিচার শক্তি যোগায়।

মার্কসীয় বিচারের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো; শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ধারণা। এটি একটি বিতর্কের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় যেমন, শিল্প কি শুধু শিল্পের জন্য, নাকি শিল্প মানুষের জন্য। এই বিতর্কের এক অংশের সমর্থকরা মনে করেন শিল্পের প্রধান দিক হলো তার আঙ্গিক, সৌন্দর্য ও আনন্দদান। অপর অংশের সমর্থকরা মনে করেন শিল্প শুধু আঙ্গিকপ্রধান হলে তার সামাজিক উপযোগিতা থাকে না-শিল্পের মধ্যে শিক্ষা বা নীতির বিষয়টি থাকতে হবে। শিল্প শুধু সমাজের সংস্কৃতিজাত ভাবের বিষয় নয় শিল্পকে বিচার করতে হবে সমাজের সংস্কৃতির বস্তুজাত ভাবের বিষয় হিসেবে। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে প্লেটো ছিলেন নীতিবাদী আর অ্যারিস্টটলের অনুগামীরা ছিলেন নান্দনিকতার পূজারি। শিল্প-সাহিত্য শুধু নান্দনিক এবং আনন্দদায়ক হবে এই মত এখনও প্রবল। এই মতটি শুনতে নির্দোষ মনে হলেও এর পরিণতিতে শিল্প-সাহিত্য ‘ফর্ম’ সর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু সাহিত্যবিচারে মার্কসবাদীরা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার বিভ্রম ভেদ করে চিরন্তনতার কথা বলতে চেয়েছে এবং আরো বলতে চেয়েছে, চিরায়ত সাহিত্যের প্রভাব বহুমুখী। এছাড়া শিল্প-সাহিত্যের বিষয়টি শুধু নন্দনতত্তে¡র উপর নির্ভর করে পর্যালোচনা করা যাবে না কারণ শিল্প সাহিত্যের যেমন সমাজের ‘মতাদর্শ’ গড়ে তোলার ক্ষমতা রয়েছে তেমনি রয়েছে সমাজে আলোড়ন তৈরি করার ক্ষমতাও। রাষ্ট্র, আইন, দর্শন এবং ধর্ম যেমন সমাজের উপরের কাঠামোর অংশ হয়েও সমাজের বুনিয়াদী-কাঠামোতে এরা মিথষ্ক্রিয়া তৈরি করে তেমনি শিল্প-সাহিত্যেরও সে ক্ষমতা রয়েছে। ফলে শিল্প-সাহিত্য শুধু ভাবের বিষয় নয়; বাস্তব জীবনেরও বিষয়। মার্কস-এঙ্গেলস মনে করেন, ভাবনা, ধারণা ও চেতনার উন্মেষ হয়েছে প্রথমত মানুষের সাথে তার বাস্তবের আদান-প্রদানে, প্রকৃত জীবনের ভাষায়। ধারণা করা, চিন্তা করার মতো মানুষের আত্মিক আদান-প্রদানও সম্ভবত স্বতোৎসারিত হয় মানুষের এই বাস্তব আচরণ থেকেই। রক্তমাংসের মানুষকে বোঝবার জন্য আমরা যেমন মানুষের বক্তব্য, কল্পনা, ভাবনা বা মানুষকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, ভাবা হয়েছে, কল্পনা করা হয়েছে, তার কোনটা থেকেই শুরু করি না; বরং আমরা সরাসরি বাস্তব সক্রিয় মানুষ থেকেই শুরু করি তেমনি চেতনা জীবনকে নির্ধারণ করে না, জীবন চেতনাকে নির্ধারণ করে।

বিষয়টি আরো বিস্তৃত করে মার্কস লিখেছেন, মানুষ তার জীবনের সামাজিক উৎপাদনের পথে কতকগুলি নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে যেগুলো অবশ্যম্ভাবী এবং ইচ্ছা নিরপেক্ষ কতকগুলো উৎপাদন সম্পর্ক, যা তার বাস্তব উৎপাদন-শক্তি বিকাশের নির্দিষ্ট স্তরের সঙ্গে সাযুজ্যসম্পন্ন। এই সব উৎপাদন-সম্পর্কের সমাহারকে বলা হয় সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো- যে বাস্তব ভিত্তির উপর গড়ে ওঠে আইন ও রাজনীতির একটি উপরিকাঠামো এবং যার সঙ্গে সামাজিক চেতনার বিভিন্ন রূপগুলি সাযুুজ্য সম্পন্ন। বাস্তব জীবনের উৎপাদনের ধরনই সাধারণভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনকে নির্ধারিত করে। মানুষের চেতনা তার সত্তাকে নির্ধারণ করে না, বরং তার সামাজিক সত্তাই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে। অর্থাৎ যে সমাজ তার যে অর্থনৈতিক স্তরে আছে সেই স্তরের উপরের কাঠামোতে বিরাজমান সামাজিক চেতনায় রাজনৈতিক, ধর্মীয়, নৈতিক ও নন্দনতাত্তি¡ক রূপকে মতাদর্শ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

মার্কসের এই ব্যাখ্যাকে সরলিকরণ করতে গিয়ে অনেকেই এটাকে যান্ত্রিকতায় পর্যবসিত করেছিল। যেমন  সমাজের অর্থনৈতিক বনিয়াদ হলো তার ভিত্তি কাঠামো এবং রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম, দর্শন, শিল্প সাহিত্য এসব হলো তার উপরি কাঠামো। এই ‘উপরি কাঠামো’ নির্ধারিত হয় ‘ভিত্তি’ অর্থাৎ তার অর্থনৈতিক বনিয়াদের উপর। এই ব্যাখ্যার যান্ত্রিকতা হলো এই যে, এই ব্যাখ্যায় মনে হয় আইন, শিল্প-সাহিত্য সবকিছুই যেন স্বাতন্ত্রহীন, অর্থনৈতিক বনিয়াদের আয়ত্তাধীন। কিন্তু তা নয়। টেরি ঈগলটন বলছেন, শিল্প-সাহিত্য উপরিকাঠামোর অংশ হতে পারে, কিন্তু তা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভিত্তির নিষ্ক্রিয় প্রতিফলন নয়। ১৮৯০ সালে জোসেফ ব্লখ-কে লেখা এক চিঠিতে এঙ্গেলসও এই কথাটি পরিষ্কার করে বলেছেন, ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা অনুযায়ী ইতিহাসে চরম নির্ধারক উপাদানটি হলো বাস্তব জীবনে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন। মার্কস বা আমি, কেউই এর থেকে বেশি কিছু বলিনি। তাই কেউ যদি এই বক্তব্যকে মোচড় দিয়ে বলে যে অর্থনৈতিক উপাদানটিই একমাত্র নির্ধারক উপাদান তাহলে সে কথাটিকে একটি অর্থহীন, বিমূর্ত ও অদ্ভুত বাক্যে পরিণত করে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হলো ভিত্তি, কিন্তু উপরিকাঠামোর বিভিন্ন উপাদান যেমন শ্রেণিসংগ্রামের রাজনৈতিক কর্মগুলি ও তার ফলাফল, যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর বিজয়ী শ্রেণির প্রবর্তিত সংবিধান ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের আইন-এমনকি যোদ্ধাদের মস্তিষ্কে এই সমস্ত বাস্তব সংগ্রামের প্রতিক্রিয়া, যেমন রাজনৈতিক, আইনগত এবং দার্শনিক বিভিন্ন তত্ত্ব, বিভিন্ন ধর্মীয় ভাবনা এবং পরে সেগুলির সংস্কারের বেড়াজালে রূপান্তর – এইসবও ঐতিহাসিক সংগ্রামের গতিপথকে প্রভাবিত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের রূপ কি হবে তার নির্ধারণে এইগুলিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়। এই প্রসঙ্গে মার্কসের গ্রুন্ড্রিসের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা যায়। তিনি লিখেছেন, শিল্পের ক্ষেত্রে একথা সুবিদিত যে কয়েকটি যুগে তাদের বিকাশের প্রাচুর্য সমাজের সাধারণ বিকাশ এবং ফলত সমাজের বাস্তব ভিত্তি বা মূল কাঠামোটির বিকাশের তুলনায় একেবারে অনুপাতহীন। উদাহরণ হিসেবে আধুনিকদের তুলনায় গ্রীকদের বা শেক্সপীয়রের কথাও বলা যেতে পারে। এটাও স্বীকৃত যে শিল্পের কয়েকটি ধরন যেমন এপিক, তাদের যুগান্তকারী, ধ্রুপদী বিশালত্বে উৎপাদন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যখনই সাধারণভাবে শিল্পের উৎপাদন শুরু হয়। অর্থাৎ শিল্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক একমাত্র শিল্প উৎপাদনের অনগ্রসর স্তরেই বিকশিত হয়। যদি শিল্পের ভিতরেই বিভিন্ন ধরনের শিল্পের সম্পর্ক এই হয়, তবে এটা তেমন আশ্চর্যের নয় যে সমগ্র শিল্পে সঙ্গে সমগ্র সমাজবিকাশের সম্পর্কের মধ্যেও এটা পরিলক্ষিত হবে।

এই সকল দ্বন্দের  কোনো সাধারণ সূত্র দেওয়াটাই অসুবিধাজনক। যখনই তাদের নির্দিষ্ট করা হয় তখনই তাদের ব্যাখ্যাও সম্পূর্ণ হয়। উপরে প্রথমে এঙ্গেলস এবং পরে মার্কসের যে দীর্ঘ উদ্ধৃতি প্রদান করা হলো তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, মার্কসীয় শিল্প-সাহিত্য বিচার যান্ত্রিকতা বা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভিত্তির নির্ধারকতার বিষয়টি দ্বারা আবদ্ধ নয়। অর্থাৎ একপেশেভাবে অর্থনৈতিক বিকাশের উপর শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ নির্ভর করে তা নয় সমাজের অনুন্নত অবস্থায়ও এপিক বা মহৎ শিল্পের বিকাশ সম্ভব। গ্রীকদের মহৎ শিল্প চর্চার ব্যাখ্যাও মার্কস সেভাবে করেছেন এবং বলেছেন আমাদের ঐতিহাসিক দূরত্ব সত্তে¡ও এখনো এইসব শিল্প আঙ্গিক আমাদের নাড়া দেয়। মার্কসের মতে সমাজের অনুন্নত অবস্থার কারণেই এপিকগুলোর সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। এই অনুন্নত সমাজ ‘শ্রমবিভাজন’ দ্বারা খণ্ডিত ছিল না এবং সেখানে মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে একটা সামঞ্জস্য ছিল। এই ক্লাসিক বা এপিকগুলো এখনো আমাদের শৈল্পিক আনন্দ দেয় এবং কিছু মাত্রায় একটা মাপকাঠি এবং অননুকরণীয় আদর্শ হিসেবে কাজ করে।

সাহিত্য বিচারেও মার্কস সমাজের ভেতরের গতিশীলতার বর্ণনার ওপর বেশি জোর দেন। যেমন তিনি বালজাকের উপন্যাসে ফরাসী সমাজের ভেতরের জীর্ণতা যেমন দেখেছেন তেমনি ফরাসী সমাজের ভাঙনের বৈশিষ্ট্যগুলোও দেখেছেন। বালজাক পুরনো সমাজের পক্ষপাতী হলেও মার্কস বলছেন বালজাক সমকালীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিসমূহের গতিপ্রকৃতি সম্পন্ধে কল্পনা শক্তির সাহায্যে এক গভীর বোধ অর্জন করেছিলেন। মার্কস এবং এঙ্গেলস কবিতা, উপন্যাস এবং মহাকাব্য সম্পর্কে শুধু ঔৎসুকই ছিলেন না তাঁরা গভীরভাবে সেসব অধ্যয়নও করেছেন। বিশেষ করে রেঁনেসাস যুগের মহৎ কবি-সাহিত্যিক এবং শিল্পীদের, ধরে ধরে তাঁরা মূল্যায়ন করেছেন। তাঁদের টুকরো টুকরো মন্তব্য, মূল্যায়ন এবং লেখার ওপর ভিত্তি করেই মার্কসীয় সাহিত্য বিচারের ধারাটি পরবর্তীতে গড়ে তোলা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় রুশ দেশে লেনিন তলস্তয়, গোর্কী এবং মায়াকোভস্কির বিচারে সেই ধারণাকে আরো বিস্তৃত করেছেন। অন্যদিকে প্লেখানভ মার্কসীয় সাহিত্য বিচারে মতাদর্শের উপর জোর দিয়েছিলেন। রাজনীতি, দর্শন ও ধর্ম বিচারের মতই শিল্প-সাহিত্যের বিচারকেও শ্রেণি আধিপত্যের বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন প্লেখানভ।

শিল্প-সাহিত্য এবং মতাদর্শের সম্পর্ক দ্বিমুখী। শিল্প-সাহিত্য পুরনো মতাদর্শের প্রচারক হতে পারে, মতাদর্শের সমালোচক হতে পারে আবার নতুন মতাদর্শের প্রবক্তাও হতে পারে। এই ভ‚মিকা পালন করতে গিয়ে যে মিথষ্ক্রিয়া হয় মতাদর্শের সঙ্গে সেখানেই শিল্পের প্রতিক্রিয়াশীলতা, প্রগতিশীলতা বা আধিপত্য প্রতিভাত হয়। ফলে শিল্প সাহিত্যের বিচার যেমন তার আঙ্গিক নিয়ে, তার নান্দনিকতা নিয়ে তেমনি তার উৎপাদন বা সৃষ্টির প্রক্রিয়া নিয়েও করা যায়। অর্থাৎ শিল্প আমাদের মতাদর্শের প্রকৃতিকে দেখতে সাহায্য করে এবং একইভাবে মতাদর্শকে সম্পূর্ণভাবে জানা, বা যাকে বলা হয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং সেই জ্ঞান অর্জনের পথে আমাদের এগিয়ে দেয়। মার্কসীয় বিচারের ধারা সাহিত্যকর্মকে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাখ্যা করতে চায়; ব্যাখ্যা করতে চায় শিল্প-সাহিত্যের আঙ্গিক, শৈলী এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ। এই বিচার শিল্প ও সাহিত্য কর্মের আঙ্গিক, শৈলী ও অর্থকে একটি নির্দিষ্ট ইতিহাসের ফল হিসেবে উপলব্ধি করতে চায়। কারণ সমস্ত শিল্পকর্মে ঐতিহাসিক যুগের ছাপ থাকে আর মহৎ শিল্প-সাহিত্য হলো সেইটিই যাতে এই ছাপ গভীরভাবে পড়েছে। হেগেলের নন্দনতত্ত¡ও অনেকটা তাই বলে। তার মতে, শিল্প-সাহিত্যকে ব্যাখ্যা করতে হয় যে ইতিহাস তার জন্ম দিয়েছে তার সাহায্যে। তাই মার্কসীয় বিচারের মৌলিকত্ব শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তার ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীতে নয়, বরং তার রয়েছে ইতিহাসের বিপ্লবী ব্যাখ্যায়।

মার্কসীয় বিচারের অন্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো পুঁজিবাদী সমাজে শিল্প-সাহিত্যের উৎপাদন বিষয়ে তার ব্যাখ্যা। মার্কসীয় ধারণায় শিল্প-সাহিত্য শুধু এক কুশলী নির্মাণ, সামাজিক চেতনার ফসল ও এক বিশ্বদৃষ্টি নয় বরং তা একটি শিল্পোদ্যোগও। এখন শিল্প-সাহিত্য শুধুমাত্র কোনো ব্যক্তির সৃষ্টিশীল কর্ম নয় এখন শিল্প-সাহিত্য উৎপাদনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে শিল্প-সাহিত্য অন্য আর দশটি পণ্যের মতোই উৎপাদিত হয়। শিল্প এক ধরনের সামাজিক উৎপাদন। যেমন, বই প্রকাশকের দ্বারা উৎপাদিত এবং মুনাফার জন্য বাজারে পণ্য হিসেবে বিক্রিত হয়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত বই মেলাসমূহে কত বই প্রকাশিত হয়েছে তার চেয়ে বড় আলোচনা হয় কত কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। বই উৎপাদনের সময় যেমন প্রকাশক প্রকাশনা শিল্পে নিয়োজীত শ্রমিকদের মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ দেয় তেমনি মুনাফার জন্য লেখককে কম পারিশ্রমিক বা রয়েলিটি দিতে পারে। নাটকের মঞ্চায়নও একটি বিরাট উৎপাদন এবং সঙ্গীতও এখন একটি পণ্য উৎপাদন। বিভিন্ন কোম্পানী বা উদ্যোক্তাদের ব্যাপক বিপুল বিনিয়োগই শুধুমাত্র নাটক এবং সঙ্গীতকে উৎপাদন এবং বাজারজাত করে মুনাফা অর্জন করতে পারে। চলচিত্রের উৎপাদন এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী একটি শিল্পই বটে। নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত, চিত্রকলা, কবিতা, উপন্যাস-এখন সবই ‘প্রডাকশন’। এই ‘প্রডাকশন’ বা উৎপাদন পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির নিয়ম মেনেই সংঘটিত হয় এবং এখানে শুধু মুনাফাই অর্জিত হয়  তাই নয়, এখানে মতাদর্শও তৈরি হয়। নাটক, সিনেমা (লেখক, পরিচালক, অভিনেতা, কলাকুশলী) দর্শকের ভোগের জন্য একটি উৎপাদিত পণ্য। যারা শিল্প-সাহিত্য সমালোচক তারা রাষ্ট্রের দ্বারা নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ বটে; তারা পাঠকের জন্য মতাদর্শও তৈরি করেন। লেখকরা শুধু পাঠকের মানসিক কাঠামো পরিবর্তন করে না তারা প্রকাশনা-সংস্থার দ্বারা বিক্রয়যোগ্য পণ্যের উৎপাদনের জন্য নিয়োজিত শ্রমিকও বটে। যেমনটি মার্কস লিখেছেন, একজন লেখক কি মাত্রায় ভাবনা উৎপন্ন করছেন তার বিচারে নয়, কি মাত্রায় তিনি প্রকাশককে ধনী করছেন ও মজুরির বিনিময়ে কাজ করছেন, সেই অনুপাতে তিনি একজন শ্রমিকও।

শিল্প-সাহিত্যের উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াটি অনুধাবন করা না গেলে আধুনিক কালে শিল্প-সাহিত্য বিচার অনেকটা কাঁচা থেকে যায়। একই সঙ্গে মার্কসীয় বিচারে শিল্প-সাহিত্য নামক এই পণ্যটি কি মতাদর্শ তৈরি করছে তা অনুধাবন করা যাবে উৎপাদিত শিল্প-সাহিত্যের টেক্সট পাঠে।

মার্কসীয় বিচারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এই বিচার শুধু পুঁজিবাদী সমাজে শিল্প-সাহিত্যের উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে না; এই সব শিল্প-সাহিত্য পণ্য হিসেবে ঔপনিবেশিকতা, উদারতাবাদ, নব্য উদারতাবাদ এবং পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করছে তারও বিচার করতে শেখায়।

মার্কসীয় বিচার শিল্প-সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত, চিত্রকলাসহ সংস্কৃতির নানা উপাদান জনমানসে কি প্রভাব ফেলছে বা জনমানসের আশা-আকাঙ্খা বা বাস্তব অবস্থা এই সব শিল্প-সাহিত্যে, চিত্রকলা, নাটক সিনেমা বা সঙ্গীতে শৈল্পিক/নান্দনিকভাবে কিভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে তাও বিচার করতে শেখায়।

সঙ্গীত, নাটক, সিনেমা, সাহিত্য, চিত্রকলার বাজার কত কোটি টাকার, তা যেমন পর্যালোচনা করতে হয় তেমনি এইসব শিল্প-সাহিত্যিক পণ্য কি মতাদর্শ তৈরি করছে তাও বিচারে আনতে হয়। আর সর্বোপরি এই বিচার থেকেই বের হয়ে আসবে এইসব শিল্পের সঙ্গে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক কোথায়। এছাড়া, শিল্প-সাহিত্য যখন পণ্য হিসেবে বৃহৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় চলে যায় তখনই জনসাধারণের হাজার বছরের সৃষ্ট লোকসাহিত্য, চিত্রকর্ম, লোক শিল্প শুকিয়ে যায়। পুঁজিবাদী সমাজে অধিকতর মুনাফার জন্য এখন শিল্প-সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, চিত্রশিল্প, সঙ্গীত নাটক পণ্য ইত্যাদি উৎপাদনে যৌনতা, বিকৃতি ও  উত্তেজনার মিশেল দেয়া হয়। পণ্য উৎপাদনের মতো শিল্প-সাহিত্য উৎপাদনও এখন জটিল এবং প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। এভাবেই পুঁজিবাদী সমাজে এখন ‘সংস্কৃতি’ উৎপাদনের নামে অপসংস্কৃতি, উৎপাদিত হয় যা অধিকতর মুনাফা তৈরি করে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদিত শিল্প-সাহিত্য শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য মতাদর্শও তৈরি করে।

মার্কসীয় বিচার তাই শিল্প-সাহিত্য-সিনেমা, নাটক ইত্যাদি মুনাফামুখী পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থার সমালোচনা করে এবং মানুষের মুক্ত স্বাধীন সৃষ্টিশীলতাকে অবারিত করার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসানের কথা বলে।

মার্কসবাদীরা মুনাফানির্ভর শিল্প-সাহিত্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সমালোচনা করে এবং যেসব শিল্প-সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, সঙ্গীত, চিত্রকলা পুঁজিবাদী, ঔপনিবেশিক ও উদারতাবাদী বা নয়াউদারতাবাদী মতাদর্শকে নানা আঙ্গিকে প্রচার করে মানুষের বাস্তব শোষণমূলক অবস্থা থেকে তাদের মুক্তির আন্দোলনকে বাধাগ্রস্থ করে তাদের পর্যালোচনা করে। এখানে উল্লেখ্য যে, পুঁজিবাদী সমাজেও মহৎ শিল্প-সাহিত্য তৈরি হয় না তা নয়। মার্কসবাদীরা বরং পুঁজিবাদী সমাজে শোষণমূলক বাস্তব অবস্থা থেকে মানুষের মুক্তির আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য; শিল্পে-সাহিত্যে নতুন দিনের বার্তা দেয়ার জন্য পথ উন্মোচন করে এবং সেসব নব শিল্প-সাহিত্যকে জনগণের সামনে তুলে ধরে।

পরিশেষে বলা যায়, শিল্প-সাহিত্যের মার্কসবাদী বিচারের মূল কথা হলো শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় মানুষের মানবীয় স্বতঃস্ফূর্ত মুক্ত বিকাশ এবং তার স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্খার নান্দনিক প্রতিফলন ঘটানো।

সূত্র:

১. মার্কস-এঙ্গেলস, অন লিটারেচার এন্ড আর্ট, প্রগ্রেস পাবলিসার্স, মস্কো, ১৯৭৮।

২. ভ.ই. লেনিন, তলস্তয় প্রসঙ্গে, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮০।

৩. টেরী ঈগলটন, মার্কসবাদ ও সাহিত্য সমালোচনা, দীপায়ন, কলকাতা, ২০১৮।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক
(নিবন্ধে প্রকাশিত অভিমত লেখকের একান্তই নিজস্ব ও ব্যক্তিগত। এটি সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে – সম্পাদক)

সর্বশেষ

×

আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ