প্রচ্ছদসম্পাদকীয়মুক্তমতসামাজিক অনুঘটন,স্বতঃস্ফূর্ততা ও সংগঠিত বিপ্লব

সামাজিক অনুঘটন,স্বতঃস্ফূর্ততা ও সংগঠিত বিপ্লব

ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক শিক্ষা
মানবসমাজের ইতিহাসে বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান কিংবা বৃহৎ সামাজিক পরিবর্তন কখনও সম্পূর্ণ পরিকল্পিত নয়, আবার কখনও সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তও নয়। ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, বড় সামাজিক বিস্ফোরণের মধ্যে সবসময়ই দুটি শক্তি ক্রিয়াশীল থাকে—
একদিকে সমাজের অভ্যন্তরে জমে থাকা বস্তুগত ও মানসিক দ্বন্দ্ব,অন্যদিকে সচেতন রাজনৈতিক সংগঠন, মতাদর্শ ও নেতৃত্ব। এই দুইয়ের দ্বান্দ্বিক সংযোগের মধ্যেই জন্ম নেয় ইতিহাসের বড় রূপান্তর।
“সামাজিক অনুঘটন” ধারণাকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো সমাজে বহুদিন ধরে জমে থাকা বৈষম্য, শোষণ, সাংস্কৃতিক অপমান, রাজনৈতিক দমন ও অর্থনৈতিক সংকট এক ধরনের “সামাজিক শক্তি” তৈরি করে। কিন্তু এই শক্তি সবসময় সংগঠিত ঐতিহাসিক রূপ নেয় না। অনেক সময় কোনো আকস্মিক ঘটনা— একটি হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় দমন, খাদ্যসংকট, শ্রমিক বিদ্রোহ, ছাত্রের আত্মদান— সমাজকে হঠাৎ বিস্ফোরিত করে তোলে। এই বিস্ফোরণের মধ্যেই থাকে স্বতঃস্ফূর্ততার উপাদান। কিন্তু ইতিহাস আরও দেখায়, স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ সবসময় স্থায়ী সামাজিক রূপান্তর ঘটাতে পারে না। যদি সেই বিস্ফোরণের সঙ্গে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি, সুস্পষ্ট কর্মসূচি, আদর্শগত দিকনির্দেশনা ও ঐতিহাসিক প্রস্তুতি যুক্ত হয়, তবে তা বিপ্লবী রূপান্তরে পরিণত হতে পারে। আর যদি সংগঠিত প্রস্তুতি পিছিয়ে থাকে, তবে সেই শক্তি অনেক সময় ছড়িয়ে যায়, দমন হয়, অথবা অসমাপ্ত থেকে যায়। এইখানেই “বস্তুনিষ্ঠ” ও “বিষয়নিষ্ঠ” প্রস্তুতির দ্বান্দ্বিক ঐক্যের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বস্তুনিষ্ঠ ও বিষয়নিষ্ঠ প্রস্তুতি : দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
মার্কসবাদী রাজনৈতিক দর্শনে “বস্তুনিষ্ঠ পরিস্থিতি” বলতে বোঝায় সমাজের বাস্তব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা— যেমন শোষণ, দারিদ্র্য, রাষ্ট্রীয় সংকট, যুদ্ধ, বেকারত্ব, জাতীয় নিপীড়ন ইত্যাদি।
অন্যদিকে “বিষয়নিষ্ঠ প্রস্তুতি” বলতে বোঝানো হয় মানুষের সংগঠিত রাজনৈতিক চেতনা, নেতৃত্ব, দল, কর্মসূচি, মতাদর্শ ও কৌশল। ইতিহাসের বহু বিপ্লব দেখিয়েছে যে, শুধু বস্তুনিষ্ঠ সংকট থাকলেই বিপ্লব হয় না। আবার কেবল সংগঠন থাকলেও বিপ্লব সম্ভব নয়, যদি সমাজে বাস্তব সংকট উপস্থিত না থাকে। যখন এই দুই একে অপরের সঙ্গে অনুরণিত হয়, তখনই সামাজিক অনুঘটন বিপ্লবী রূপান্তরে পরিণত হয়।
লেনিন ও ভ্যানগার্ড পার্টির ধারণা  
Vladimir Lenin এই প্রশ্নটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সবসময় বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনায় উন্নীত হয় না। এই কারণেই তিনি “ভ্যানগার্ড পার্টি” বা অগ্রণী বিপ্লবী দলের ধারণা দেন। তাঁর মতে, বিপ্লবী সংগঠন সমাজের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষকে সুসংগঠিত রাজনৈতিক লক্ষ্যে রূপান্তরিত করে। ১৯১৭ সালের October Revolution এই দ্বান্দ্বিক ঐক্যের একটি অসাধারণ উদাহরণ।
রাশিয়ায় তখন যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও জারতান্ত্রিক নিপীড়নের কারণে বস্তুনিষ্ঠ পরিস্থিতি বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছিল। ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ছিল অনেকাংশে স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু সেই আন্দোলন তখনও সুস্পষ্ট সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে রূপান্তরিত হয়নি। বলশেভিক পার্টি এই স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক শক্তিকে সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেছিল। “শান্তি, ভূমি ও রুটি”— এই স্লোগান কেবল প্রচারণা ছিল না; এটি ছিল সামাজিক অনুঘটনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের অনুরণন। এখানে দেখা যায়, বিপ্লবের সামাজিক শক্তি আগে থেকেই ছিল, কিন্তু সংগঠিত নেতৃত্ব সেই শক্তিকে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক রূপ দেয়।
চীনা বিপ্লব : দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অনুঘটনের সংগঠন
China-এর বিপ্লব আরও গভীর উদাহরণ। চীনে সামন্তবাদ, উপনিবেশবাদী আগ্রাসন, দারিদ্র্য ও কৃষকশোষণ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহ ও স্থানীয় প্রতিরোধ ছিল অনেকাংশে স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু এগুলি দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটাতে পারেনি। Chinese Communist Party এই স্বতঃস্ফূর্ত কৃষক অসন্তোষকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে।
Mao Zedong বুঝতে পেরেছিলেন যে, সামাজিক অনুঘটনকে স্থায়ী বিপ্লবী শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সংগঠন, মতাদর্শ, সামরিক কৌশল ও জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনার ঐক্য প্রয়োজন। চীনা বিপ্লবের “লং মার্চ” ছিল কেবল সামরিক পশ্চাদপসরণ নয়; এটি ছিল বিপ্লবী সংগঠনের পুনর্গঠন। পরবর্তীকালে জাপানি আগ্রাসন ও জাতীয় সংকট নতুন সামাজিক অনুঘটন তৈরি করে, যা কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠিত শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯৪৯ সালের বিপ্লবে পরিণত হয়।
সামাজিক অনুঘটন ও অসম্পূর্ণ বিপ্লব
ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণও আছে যেখানে সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু সংগঠিত প্রস্তুতির অভাবে তা সফল ঐতিহাসিক রূপান্তরে পৌঁছাতে পারেনি।
প্যারিস কমিউন
১৮৭১ সালের Paris Commune ছিল শ্রমিকশ্রেণির এক অসাধারণ স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান। জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও সামরিক কৌশলের সীমাবদ্ধতার কারণে তা স্থায়ী হয়নি। মার্কস পরে এই অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখান যে, জনগণের বিপ্লবী শক্তি ছিল বিশাল, কিন্তু সংগঠিত রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না।
আরব বসন্ত
একবিংশ শতাব্দীর Arab Spring-ও সামাজিক অনুঘটনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিউনিসিয়ায় এক তরুণ ফেরিওয়ালার আত্মাহুতি মুহূর্তেই গোটা আরব বিশ্বে গণবিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এটি ছিল সামাজিক অনুঘটনের শক্তিশালী উদাহরণ। কিন্তু অনেক দেশে সংগঠিত রাজনৈতিক বিকল্প, বিপ্লবী নেতৃত্ব ও সুসংহত কর্মসূচির অভাবে আন্দোলন হয় দমন হয়েছে, নয়তো গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয়েছে।
এখানে স্পষ্ট হয় যে, সামাজিক অনুঘটন বিপুল শক্তি সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সংগঠিত ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা ছাড়া সেই শক্তি স্থায়ী রূপান্তরে পৌঁছানো কঠিন।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা : স্বতঃস্ফূর্ততা ও সংগঠনের মিলন
বাংলাদেশের ইতিহাসেও এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সুস্পষ্ট। ভাষা আন্দোলন ছিল ছাত্রসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ, কিন্তু এর পেছনে ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। একাত্তরে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, মুক্তিবাহিনী, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ঐতিহাসিক বিজয়ে রূপ দেয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের ইতিহাসও দেখায় যে, সামাজিক অনুঘটন এবং সংগঠিত রাজনৈতিক প্রস্তুতির মিলনই বড় ঐতিহাসিক সাফল্যের জন্ম দেয়।
সামাজিক অনুঘটনের দ্বান্দ্বিক সূত্র
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দাঁড় করানো যায়:
> “বস্তুনিষ্ঠ সংকট সমাজে বিপ্লবী সম্ভাবনা সৃষ্টি করে;
সামাজিক অনুঘটন সেই সম্ভাবনাকে বিস্ফোরিত করে;
আর সংগঠিত রাজনৈতিক চেতনা সেই বিস্ফোরণকে ইতিহাসের রূপ দেয়।”
এই সূত্রের আলোকে দেখা যায়, বিপ্লব কখনও নিছক পরিকল্পনার ফল নয়, আবার নিছক আকস্মিক বিস্ফোরণও নয়। এটি স্বতঃস্ফূর্ততা ও সংগঠনের দ্বান্দ্বিক ঐক্য।
উপসংহার
মানবসমাজের ইতিহাসে সামাজিক অনুঘটন এক গভীর বাস্তবতা। মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান ও বঞ্চনা অনেক সময় একটি প্রতীকী ঘটনার মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়। কিন্তু সেই বিস্ফোরণকে স্থায়ী সামাজিক রূপান্তরে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন সংগঠিত রাজনৈতিক প্রস্তুতি, মতাদর্শগত দিকনির্দেশনা এবং ঐতিহাসিক নেতৃত্ব। লেনিনের ভ্যানগার্ড পার্টি, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘ সংগ্রাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ— সবকিছুই দেখায় যে, ইতিহাসের বড় পরিবর্তন ঘটে তখনই, যখন সামাজিক অনুঘটন এবং সংগঠিত চেতনা পরস্পরের সঙ্গে অনুরণিত হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শুধু অতীত বোঝায় না; এটি ভবিষ্যতের সামাজিক পরিবর্তনের গতিবিদ্যাও বুঝতে সাহায্য করে।
লেখক- অধ্যাপক ড. এস কে দাস

সর্বশেষ