মোদির কেন্দ্রীয় সরকার তিনটি প্রগতিশীল আঞ্চলিক সরকারকে মোকাবিলায় সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করেছে, কারণ তাদের নেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে মোদির জাতীয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
৬ মে ২০২৬ | বিজয় প্রসাদ, অনুবাদঃ ড. এস কে দাস
[প্রবন্ধের মতামত লেখকের নিজস্বঃ সম্পাদক]
ভারতে আসাম, কেরল, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ—এই চারটি রাজ্যে (যেখানে মোট প্রায় ২৯০ মিলিয়ন মানুষের বাস) রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ১২৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। এই রাজ্যগুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—দুটি দক্ষিণ ভারতে, একটি পূর্ব ভারতে এবং একটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৯ সালের আগে হওয়ার কথা নয়, ফলে এই নির্বাচনগুলোকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার যখন জ্বালানি ও খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন এই নির্বাচনগুলো তার জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
এই নির্বাচনের তিনটি তাৎক্ষণিক তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমত, “স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন” (SIR)-এর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাত্রা এতটাই প্রবল ছিল যে তা গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল করেছে। অনেকের মতে, এই প্রক্রিয়াই পশ্চিমবঙ্গে (জনসংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি) মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) জয়ী হতে সহায়তা করেছে। দ্বিতীয়ত, “জেন-জি” বা মতাদর্শ-পরবর্তী রাজনীতির প্রবণতা তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র তারকা বিজয়ের দল “তামিঝাগা ভেত্রি কাঝাগম” (TVK)-এর বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। তৃতীয়ত, কেরলে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (LDF) পরাজয়ের ফলে গত পাঁচ দশকের মধ্যে এই প্রথম ভারতের কোথাও কোনো কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সরকার রইল না।
ক্ষমতাসীন বিরোধী ঢেউ?
প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু এবং কেরলের ক্ষমতাসীন সরকারগুলো “অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি” বা ক্ষমতাসীন বিরোধী জনমতের ঢেউয়ে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে এই ব্যাখ্যা অতিরিক্ত সরল মনে হয়।
উদাহরণস্বরূপ, কেরলে কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকার চরম দারিদ্র্য কার্যত বিলোপ করতে সক্ষম হয়েছিল—যা ভারতের মধ্যে প্রথম, এমনকি চীনের বাইরেও প্রথম উদাহরণ। একই সঙ্গে তারা শিশু মৃত্যুহার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে পাঁচের নিচে নামিয়ে আনে, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও কম। এমন সাফল্যের পরও ভোটাররা কেন এলডিএফকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পরাজয় দিলেন, তার সহজ ব্যাখ্যা নেই।
মোদির কেন্দ্রীয় সরকার এই তিনটি আঞ্চলিক সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বাত্মক ব্যবহার করেছে, কারণ তাদের নেতারা বিভিন্ন প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছিলেন। মূল সমস্যা হলো—মোদি ভারতের ফেডারেল কাঠামোকে দুর্বল করে ক্ষমতা নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীভূত করতে চান। অ-বিজেপি রাজ্য সরকারগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করেছে, বিশেষত দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো।
দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের যুক্তি হলো, তাদের রাজ্যগুলো অর্থনৈতিকভাবে অধিক গতিশীল হওয়ায় সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উত্তর ভারতের তুলনায় কম। ফলে ভবিষ্যতে যদি জাতীয় নির্বাচনী মানচিত্র পুনর্নির্ধারণ করা হয়, তবে কেন্দ্রীয় সংসদে দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধিত্ব কমে যাবে।
এই নির্বাচনে মোদি ব্যক্তিগতভাবে তিনজন নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করেন—পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিলনাড়ুর এম. কে. স্ট্যালিন এবং কেরলের পিনারাই বিজয়ন। শেষ পর্যন্ত তারা সবাই পরাজিত হন। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারকে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে “অনুপ্রবেশ” ইস্যুকে সামনে এনে মুসলিম বিরোধী প্রচারণা চালানো হয়, যাতে ধর্মীয় মেরুকরণ সৃষ্টি করা যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্ট্যালিন—উভয়েই নিজেদের আসনে পরাজিত হন।
জেন–জি কি ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ করল?
তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা চন্দ্রশেখরন জোসেফ বিজয় তার ৮৫ হাজার ভক্তক্লাবের ভিত্তিতে নিজের দল গঠন করেন। তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র তারকা, ভক্তগোষ্ঠী এবং রাজনীতির সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিজয়ের প্রচারণায় একটি নতুন দিক ছিল।
তার পুরো রাজনৈতিক আবহ গড়ে উঠেছিল ডিজিটাল দক্ষতা, অনলাইন-সচেতন সামাজিক ইস্যু এবং প্রচলিত রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসের প্রতি একধরনের অধৈর্যের উপর। তার প্রচারণার উন্মাদনা, দলীয় আনুগত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা এবং সাংস্কৃতিক আবেদনকে রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া—এসবই তাকে বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৭৪ সালে জন্ম নেওয়া বিজয় তরুণ ভোটারদের সঙ্গে এমনভাবে সংযোগ স্থাপন করেন যে, ১৯৫৩ সালে জন্ম নেওয়া জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন কিংবা ১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এডাপ্পাড়ি পালানিস্বামি—কেউই তার আকর্ষণের সমকক্ষ হতে পারেননি।
কিন্তু “বিজয় ঘটনা” মূলত চিত্রনির্ভর; নীতিগত স্পষ্টতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার ক্ষেত্রে তা দুর্বল। এটি বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বহন করে—যেখানে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণপন্থী শক্তি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল। একইভাবে নেপালের জেন-জি আন্দোলনও এমন এক সরকার সৃষ্টি করেছে, যা ডানমুখী এবং নীতিগতভাবে অসংলগ্ন।
অনেক দিক থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়কেও এক ধরনের জেন-জি ঢেউ বলে মনে হয়েছে—এবার তা ছিল “কসপ্লে হিন্দুত্ব” বা অভিনয়ধর্মী হিন্দু জাতীয়তাবাদ। এটি নিজেকে প্রকাশ করেছে সাধারণীকৃত অভিবাসী বিরোধী ও মুসলিমবিরোধী ভাষার মাধ্যমে, এবং একই সঙ্গে “অ্যান্টি-পলিটিক্স” বা রাজনীতি বিরোধী অস্পষ্ট মনোভাবের মধ্যে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের কেন্দ্র করে দুর্নীতি বিরোধিতা ও স্বচ্ছতার যে বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, তা অনেকাংশে “বয়স্ক রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে” এক সাংস্কৃতিক অবস্থান হিসেবে কাজ করেছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী (জন্ম ১৯৭০) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (জন্ম ১৯৫৫) তুলনায় অপেক্ষাকৃত তরুণ হওয়ায় নিজেকে “নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি” হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। কিন্তু এই তরুণ হাসিমুখ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চাকচিক্যের আড়ালে ছিল ভোটার বঞ্চনা, ধর্মীয় বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা এবং বিজেপির পুরনো হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ—যার শিকড় মাত্র একশো বছর আগে নির্মিত এক পৌরাণিক কল্পনায়। মিডিয়া-সচেতন ব্যক্তিত্বেরা বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধানের প্রয়োজনীয়তাকেই আড়াল করে ফেলেছে। এটাই প্রকৃত জেন-জি ঘটনাপ্রবাহ—শুধু তরুণদের রাস্তায় নেমে পরিবর্তনের দাবি তোলাই এর সারকথা নয়।
অভিবাসী শ্রমিক ও ভোটাধিকার
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বাংলাদেশের অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করলেও, এর প্রভাব পড়ে অন্য অভিবাসী জনগোষ্ঠীর উপরও। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৪৫৬ মিলিয়ন শ্রমিক দেশের ভেতরেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অভিবাসন করেছেন—যা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
কিন্তু এই শ্রমিকদের অধিকাংশই যে রাজ্যে কাজ করেন, সেখানে ভোট দিতে পারেন না। কারণ ভোটার নিবন্ধন স্থায়ী ঠিকানার সঙ্গে যুক্ত, আর অধিকাংশ অভিবাসী শ্রমিকের নাম রয়ে যায় তাদের নিজ গ্রামের ভোটার তালিকায়। ফলে ভোট দিতে হলে তাদের বাড়ি ফিরতে হয়—যা ব্যয়বহুল ও ঝামেলাপূর্ণ। এর ফলেই তাদের অংশগ্রহণ কমে যায়।
ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এই নীরব ভোটাধিকার-বঞ্চনা, যার শিকার মূলত উত্তর ভারতের দরিদ্র রাজ্যগুলো থেকে দক্ষিণ ভারতের তুলনামূলক উন্নত অঞ্চলে কাজের সন্ধানে যাওয়া শ্রমিকেরা।
এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের ডোমকল আসনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সিপিআই(এম)-এর প্রার্থী মোস্তাফিজুর “রানা” রহমান এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন। তরুণ ও উদ্যমী এই রাজনীতিক শুধু নিজের এলাকায় প্রচারণা চালাননি; দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে অভিবাসী শ্রমিকদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেন।
অনেক শ্রমিক ভোট দিতে ডোমকলে ফিরে আসেন এবং নির্বাচনের আগে রাজ্যের বাইরে কর্মরত চারশোরও বেশি শ্রমিক পরিবার সিপিআই(এম)-এ যোগ দেয়। রানার বিজয় পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের দীর্ঘ খরার অবসান ঘটায়—যা শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে, টানা চৌত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বামফ্রন্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে।
এই বিজয় আসলে ভারতের অভিবাসী শ্রমিকদের বিজয়—যাদের কথা “জেন-জি” নিয়ে আলোচনার তুলনায় অনেক কম শোনা যায়, অথচ যাদের প্রশ্নই হয়তো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিজয় প্রসাদ একজন ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক। তিনি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক, যার মধ্যে রয়েছে Washington Bullets, Red Star Over the Third World, The Darker Nations: A People’s History of the Third World, The Poorer Nations: A Possible History of the Global South এবং গ্রিভ চেলওয়ার সঙ্গে যৌথভাবে রচিত How the International Monetary Fund Suffocates Africa। তিনি ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ-এর নির্বাহী পরিচালক, Globetrotter-এর প্রধান সংবাদদাতা এবং LeftWord Books (নয়াদিল্লি)-এর প্রধান সম্পাদক। তিনি Shadow World (২০১৬) এবং Two Meetings (২০১৭) চলচ্চিত্রেও অংশগ্রহণ করেছেন।
এই প্রবন্ধটি Globetrotter প্রকাশ করেছে।



