ভূমিকা:
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি বিশ্ব এক অভূতপূর্ব নাটকীয় মোড়ের সাক্ষী হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানে। কারাকাসসহ বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয় এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। মার্কিন সূত্রে এই অভিযানটি “অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ” নামে পরিচিত। এ অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ভেনিজুয়েলার বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ৩২ জন কিউবান সামরিক উপদেষ্টা রয়েছেন; পাশাপাশি বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানে ভেনিজুয়েলার সামরিক সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারান। মাদুরোকে নিউইয়র্কে নিয়ে গিয়ে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন ঘোষণা করে যে, একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে তারা সাময়িকভাবে ভেনিজুয়েলাকে “পরিচালনা” করবে এবং দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহার করে অর্থনীতিকে “স্থিতিশীল” করার উদ্যোগ নেবে।
জাতিসংঘ এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং একে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে। চীন এই পদক্ষেপকে ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর এক আধিপত্যবাদী আগ্রাসন হিসেবে নিন্দা জানায়। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্রভাবে বিভক্ত: আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই অভিযানের প্রশংসা করেন, অন্যদিকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা একে আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন এবং একটি বিপজ্জনক নজির হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিউবা নিহত সামরিক সদস্যদের স্মরণে জাতীয় শোক পালন করে এবং মার্কিন পদক্ষেপকে “যুদ্ধের শামিল” বলে ঘোষণা করে। রাশিয়া সরকার একে “সশস্ত্র আগ্রাসনের কার্যক্রম” হিসেবে অভিহিত করে, যা সংঘাতটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করে তোলে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক গণবিক্ষোভ সংঘটিত হয়, যা ইস্যুটিকে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের এই নাটকীয় অধ্যায়টি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। এটি বহু বছর ধরে বিকশিত এক গভীর সংকটের সর্বশেষ—এবং সম্ভবত সবচেয়ে তীব্র—পর্ব, যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া ও বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্ব।
২০১৯ সালের রাজনৈতিক ভাঙন এবং বৈধতার প্রশ্ন:
সমসাময়িক ভেনিজুয়েলা সংকট আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি, যখন নিকোলাস মাদুরোর দ্বিতীয় মেয়াদের শপথগ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অবৈধ ঘোষণা করে। তাদের অভিযোগ ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদো নিজেকে “অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট” ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং লিমা গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য দ্রুত তাঁকে স্বীকৃতি দেয়; পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশও সেই পথে হাঁটে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এ ধরনের স্বীকৃতি ছিল নজিরবিহীন এবং তা বিশ্বজনমতকে তীব্রভাবে বিভক্ত করে। তবে এই কূটনৈতিক আক্রমণ সত্ত্বেও গুইদোর ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা ২০২২–২০২৩ সালের মধ্যে ভেঙে পড়ে। এমনকি প্রাথমিক কিছু সমর্থক দেশও তাঁর স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয়, আর দেশের ভেতরে মাদুরোর সাংবিধানিক বৈধতা নতুন করে জোরদার হয়। এই পর্বটি দেখিয়ে দেয় যে বাইরে থেকে আরোপিত বৈধতার স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সংকটটি নিছক অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংঘাতের অংশ।
নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং ২০২৬-এর পথ:
২০২৬ সালের সামরিক অভিযানের বহু আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যা অনেক বিশ্লেষকের মতে “অর্থনৈতিক যুদ্ধ”, তা শুরু করেছিল। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক ও তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০১৯ সালের মধ্যে তা নাটকীয়ভাবে তীব্রতর হয়। লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-কে দুর্বল করা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ভেনিজুয়েলার প্রবেশাধিকার কার্যত বন্ধ করে দেওয়া। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার স্বর্ণভাণ্ডার জব্দ করা অর্থনৈতিক চাপে আরও ঘি ঢালে। এর ফলে ভেনিজুয়েলার জিডিপি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়, হাইপারইনফ্লেশন দেখা দেয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র ঘাটতি সৃষ্টি হয়—যার জন্য প্রায়শই “ব্যর্থ সমাজতন্ত্র”-কে দায়ী করা হয়েছে, যদিও নিষেধাজ্ঞার জবরদস্তিমূলক ভূমিকা ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে। ২০২৩–২০২৪ সালে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখে যুক্তরাষ্ট্র এসব নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ শিথিল করে। এতে স্পষ্ট হয় যে নিষেধাজ্ঞার পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের প্রতি কোনো নীতিগত অঙ্গীকার নয়।
প্রাকৃতিক সম্পদ, ভূরাজনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ:
ভেনিজুয়েলার ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কেন্দ্রে রয়েছে তার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেলভাণ্ডার, বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত এবং সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বলিভারিয়ান বিপ্লব এই সম্পদের ওপর বিদেশি আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়। রাষ্ট্রায়ত্ত নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তেল আয়ের বড় অংশ সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সংহতিতে ব্যয় করা হয়। এর ফলে বহু দশক ধরে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি ও খনিজ খাত নিয়ন্ত্রণকারী বহুজাতিক করপোরেশন ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। চাভেজের নীতি, যা মাদুরোর শাসনামলেও বজায় ও সম্প্রসারিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে। ফলে ভেনিজুয়েলা কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র নয়; বরং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও সম্পদ-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলোর বৃহত্তর লড়াইয়ে এক কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : নব্যউদারবাদ, প্রতিরোধ এবং বলিভারিয়ান বিপ্লব:
ভেনিজুয়েলার সংকটকে বুঝতে হলে এর দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে—ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, অলিগার্কিক শাসন এবং নব্যউদারবাদী পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতা। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেওয়া কাঠামোগত সংস্কার সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দেয়। ১৯৮৯ সালের কারাকাসো বিদ্রোহে সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়, যা নির্মম দমন-পীড়নের মুখে পড়ে। ১৯৯৮ সালে চাভেজের উত্থান এই নব্যউদারবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, সম্পদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক সংহতির ভিত্তিতে বলিভারিয়ান বিপ্লবের সূচনা করে।
হাইব্রিড যুদ্ধ এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি:
২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ভেনিজুয়েলা কার্যত হাইব্রিড যুদ্ধের এক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, গোপন তৎপরতা, মিডিয়া বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত—এই সবকিছুর সমন্বয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও অবৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা চলে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এসব কৌশল সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু ওই মাসেই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে, আন্তর্জাতিক আইনের রীতি ভেঙে সংকটটিকে পূর্ণাঙ্গ ভূরাজনৈতিক সংঘাতে রূপ দেয়।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া এবং নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা:
আগেই বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের হস্তক্ষেপ বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্নে গভীর বিভাজনকে নগ্ন করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সরকারগুলোর সমর্থনের বিপরীতে, গ্লোবাল সাউথের বহু রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। চীন, রাশিয়া ও কিউবা এই হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে কয়েকজন লাতিন আমেরিকান নেতা তা সমর্থন করেছেন—যা বৈশ্বিক শক্তির বিন্যাসে গভীর ফাটলকে প্রতিফলিত করে। জাতিসংঘ নিজেও নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
উপসংহার: সার্বভৌমত্ব, প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ:
ভেনিজুয়েলার সংকট কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়। এটি সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, সম্পদকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি এবং নব্যউদারবাদী পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতার এক জ্বলন্ত প্রকাশ—যার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি। সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা বহু দেশের কাছে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—কীভাবে বহিরাগত হস্তক্ষেপকে মানবিকতা বা গণতন্ত্রের নামে উপস্থাপন করা হয়, অথচ বাস্তবে তা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে। ভেনিজুয়েলার সংগ্রাম তাই একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক সংঘাতের প্রতীক, যেখানে একদিকে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা, অন্যদিকে জনগণের সার্বভৌমত্ব। শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে, তার প্রতিধ্বনি লাতিন আমেরিকার সীমানা ছাড়িয়ে আগামী দশকগুলোর আন্তর্জাতিক রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
লেখক- প্রফেসর ড. সুশান্ত দাস


