বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সবচাইতে বড় সংকট কি –এই প্রশ্ন করলে একবারে যত চিত্র সামনে চলে আসবে, তারমধ্য থেকে ‘সবচাইতে’ এই কথাটি উড়ে যাবে। ক’দিন চললো, তেলের সংকট। তেলের জন্য তেল পাম্পে লম্বা লাইন, বিচিত্র ধরণের কলহ মারামারি, গোটা শ্যালো মেশিন মাথায় করে কৃষকের পাম্পের দ্বারে দ্বারে ঘোরা। সমাজ মাধ্যমের খবরে কৃষকের মৃত্যু-এটাও প্রচারিত। সরকারি মন্ত্রীদের ভাষায় দেশ হ্যারিকেনের যুগে চলে যাবার ভয় দেখানো- কিছুটা ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। কারণ আমরা হ্যারিকেন চিনি, হাতে হ্যারিকেন ধরনোর অর্থ বুঝি।-আজকালকার ছেলেমেয়েরা তা চেনে না-ফলে তাদের ভয়ও নাই। যাহোক, তেলের দাম বাড়ার সংগে সংগে পাম্পে গাড়ীর লাইন কমে যাচ্ছে। তার অর্থ বোঝা গেল- যুক্তরাষ্ট্র-ইস্রাইল বনাম ইরানের যুদ্ধের মুনাফা চলে গেল দেশি-বিদেশি তেল ব্যবসায়ীদের হাতে। এখন এর জেরে বাসের ভাড়া বৃদ্ধি, বাজারে চাল-ডাল-তেল-নুনের দাম বৃদ্ধির দায় পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। এ ছাড়া টিকার অভাবে কত শিশু হামে মারা গেল, তার হিসেব প্রধান গণমাধ্যমে না থাকলেও –সামাজিক মাধ্যমে ছিঁটেফোটা হলেও বের হয়। তাই বাংলাদেশে আজ সবচাইতে বড় সংকট হলো, কোন সংকটেরই খবর না থাকা-সংকটের ব্যাপারে কারুর মধ্যে কোন সংকট নাই। তাই এমনি যত কথার মধ্যে একটি কথা কিছুটা রাস্তায় ঘুরছে সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দলগুলোর দাবীতে, তা শুধু পত্রপত্রিকায় বিবৃতি নয়, রাজপথেও কিছুটা আছে। স্মারকলিপি সংসদের স্পীকারের হাতেও পৌঁছানো গেছে। সংসদে পয়েন্ট অফ অর্ডারে উঠতে না উঠতে মাননীয় স্পীকারের হস্তক্ষেপে তা উঠতে পারেনি। আর সেই কথাটি হলো – NDA. Non-disclosure Agreement. ‘অপ্রকাশিতব্য চুক্তি’। যেহেতু, এটি অপ্রকাশিতব্য , সেহেতু, এর উপরে আন্দাজে, একাডেমিক আলোচনা ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়। তাই এ নিয়ে একটু একাডেমিক আলোচনা করলাম। অর্থাৎ নাই কাজ তো খই ভাজ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে Bangladesh এবং United States-এর মধ্যে আলোচিত অ-প্রকাশ্য চুক্তি (NDA)—যা Muhammad Yunus-সংশ্লিষ্ট অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়কার বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছে—এক ধরনের অস্বচ্ছতা, অনুমান এবং উদ্বেগের জটিল আবহ তৈরি করেছে। সংসদীয় বিতর্ক বা সরকারি প্রকাশনার মাধ্যমে জনসমক্ষে আসা আনুষ্ঠানিক চুক্তির বিপরীতে, এই NDA মূলত এক ছায়াময় উপকরণ হিসেবে বিদ্যমান: আংশিকভাবে স্বীকৃত, সাংবাদিকতামূলক প্রতিবেদন থেকে অনুমিত, এবং ফাঁস হওয়া তথ্য ও নীতিগত বিশ্লেষণের আলোকে ব্যাখ্যাত। এর প্রকৃত পাঠ গোপন থাকায়, এর তাৎপর্য কেবল এর বিষয়বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর গোপনীয়তা যে কী আড়াল করে এবং কী সম্ভব করে তোলে, সেই প্রশ্নেও নিহিত।
বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে যে পরিমাণ তথ্য যুক্তিসঙ্গতভাবে নির্ণীত করা যায়, তা হলো—এই NDA একটি বৃহত্তর পারস্পরিক বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্ণনা অনুযায়ী, উভয় পক্ষই খসড়া শর্তাবলি, আলোচনার কৌশল এবং সম্ভাব্য ছাড়-সুবিধা প্রকাশ না করার বিষয়ে সম্মত হয়। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এ ধরনের বিধান অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই বিশেষ ক্ষেত্রে গোপনীয়তার পরিসর অস্বাভাবিকভাবে বিস্তৃত বলে প্রতীয়মান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, দেশীয় নীতিনির্ধারণী কাঠামোর কিছু অংশ—এমনকি বৃহত্তর জনপরিসরও—তথ্যে অর্থবহ প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে, এই NDA কেবল আলোচনার কৌশল রক্ষাই করেনি; বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকেই এক সংকীর্ণ নির্বাহী বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে।
প্রাপ্ত প্রতিবেদন এবং প্রচলিত আইনি রীতিনীতির আলোকে NDA-টির সম্ভাব্য কাঠামো পুনর্গঠন করলে দেখা যায়, এর কেন্দ্রে রয়েছে “গোপনীয় তথ্য”-এর একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা—যার মধ্যে খসড়া চুক্তি, শুল্ক-তালিকা, নিয়ন্ত্রক প্রস্তাবনা এবং আলোচনাকালীন সকল প্রকার পত্রালাপ অন্তর্ভুক্ত। এই সংজ্ঞা সম্ভবত লিখিত নথির বাইরে মৌখিক যোগাযোগ ও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে, যাতে কার্যত পুরো প্রক্রিয়াটিই গোপনতার আচ্ছাদনে আবৃত থাকে।
দ্বিতীয়ত, এবং সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ, হলো অ-প্রকাশের বাধ্যবাধকতা। উভয় পক্ষই পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে আলোচনার কোনো তথ্য প্রকাশ না করার অঙ্গীকার করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ দাঁড়িয়েছে সংসদীয় তদারকি ও জনপরিসরের বিতর্কের কার্যত বর্জন। সংবাদমাধ্যমের বিবরণ অনুযায়ী, তথ্যপ্রকাশ কেবল নিরুৎসাহিতই করা হয়নি; বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে অনুমোদনহীন তথ্যফাঁসের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা আইনি শাস্তির আশঙ্কা ছিল। তথ্য ফাঁসের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও শোনা যায়—যা ইঙ্গিত করে যে, NDA-টির প্রয়োগ কেবল প্রতীকী ছিল না।
আরেকটি সম্ভাব্য ধারা হলো গোপনীয়তার মেয়াদ। সাধারণত NDA আলোচনাকালীন সময়ে প্রযোজ্য থাকলেও, এখানে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে কিছু তথ্যের ক্ষেত্রে এই গোপনীয়তা চুক্তি সম্পাদনের পরও বহাল থাকতে পারে। এই সময়গত সম্প্রসারণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ, চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরও জনগণ সেই চুক্তির অন্তর্নিহিত বিনিময় ও সমঝোতার প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞাত থেকে যেতে পারে। অর্থাৎ, এই NDA কেবল স্বচ্ছতাকে বিলম্বিতই করে না; আংশিকভাবে তা অবরুদ্ধও করে।
তথ্যের ব্যবহার-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আলোচনাসংক্রান্ত উপাদান কেবল চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই ব্যবহারযোগ্য—এমন বিধান থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এর বিস্তৃত প্রভাব হলো, বহিরাগত বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং স্বাধীন বিশ্লেষকদের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে এসব তথ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়াটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং আলোচনাকারী পক্ষগুলোর মধ্যে তথ্যগত বৈষম্য আরও সুদৃঢ় হয়।
তবে সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি NDA-র অন্তর্গত নয়, বরং এটি যে বিষয়বস্তুকে আড়াল করে রাখে, সেটি। বিভিন্ন সংবাদ ও বিশ্লেষণে সম্ভাব্য কিছু শর্তের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—যেমন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বিস্তৃত বাজার-প্রবেশাধিকার, মার্কিন নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন, সরকারি ক্রয়নীতিতে পরিবর্তন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কৌশলগত বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উপাদান। এই প্রতিটি উপাদান নিশ্চিতভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—NDA এই সম্ভাব্য শর্তগুলোকে উন্মুক্ত পর্যালোচনার বাইরে রেখেছে। গোপনীয়তার এই আবরণ এসব শর্তের তাৎপর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে, কারণ এগুলো জনপরিসরের সেই আলোচনামঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যেখানে এগুলোর প্রভাব সম্যকভাবে মূল্যায়িত হতে পারত।
এখানেই মূল প্রশ্নটি উদ্ভূত হয়: এ ধরনের NDA বাস্তবে সার্বভৌমত্ব ও নীতিগত স্বায়ত্তশাসনকে কীভাবে প্রভাবিত করে? আনুষ্ঠানিক অর্থে বাংলাদেশ তার পূর্ণ সার্বভৌম কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখে। রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করে, স্বীকৃত সরকারের মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদন করে, এবং নীতিগতভাবে প্রস্তাবিত শর্ত গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা বজায় রাখে। কিন্তু সার্বভৌমত্ব কেবল আইনি স্বাধীনতার বিষয় নয়; এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ ও প্রক্রিয়ার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যখন তথ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। ক্ষমতা বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে সরে এসে একটি সীমিত নির্বাহী বলয়ের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়—যার ফলে সংসদ, জনমত এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণের ভূমিকা ক্ষীণ হয়ে যায়।
নীতিগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর এর প্রভাব আরও দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত। কঠোর গোপনীয়তার আবরণে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিগুলো প্রায়ই ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তকে পূর্বনির্ধারিত করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি বাংলাদেশ নির্দিষ্ট মানদণ্ডে সামঞ্জস্য স্থাপন বা নির্দিষ্ট খাত উন্মুক্ত করার বিষয়ে সম্মত হয়, তবে ভবিষ্যতে বিকল্প শিল্পনীতি বা উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। NDA এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে তাদের গঠনের পর্যায়ে আড়াল করে রেখে জনসচেতনতার সময়সীমাকে সংকুচিত করে। যখন চুক্তি জনসমক্ষে আসে, তখন তা প্রত্যাহারের ব্যয়—কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভাবমূর্তিগত—প্রায়ই অত্যধিক হয়ে ওঠে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতার বৈষম্য। যুক্তরাষ্ট্র, তার বিপুল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে, বাণিজ্য আলোচনায় একটি কাঠামোগত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে গোপনীয়তা সমতা সৃষ্টি করে না; বরং বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও দৃঢ় করে। বাংলাদেশ, তার বিস্তৃত বুদ্ধিবৃত্তিক ও নীতিগত সম্পদকে সক্রিয় করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে, একটি সংকীর্ণ জ্ঞানগত পরিসরে আলোচনায় অংশ নিতে বাধ্য হয়। এই অর্থে সার্বভৌমত্ব সরাসরি খর্ব হয় না, কিন্তু সূক্ষ্মভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে গোপনীয়তা নিজেই অবৈধ বা অগ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক আলোচনায় অনেক সময়ই একটি নির্দিষ্ট মাত্রার গোপনীয়তা অপরিহার্য। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন এই গোপনীয়তা সীমাহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে—যখন এটি কেবল জনসাধারণকেই নয়, বরং জনস্বার্থ রক্ষার জন্য নির্মিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকেও পাশ কাটিয়ে যায়। তখন NDA একটি প্রক্রিয়াগত উপকরণ থেকে রাজনৈতিক যন্ত্রে পরিণত হয়, যা কেবল ফলাফল নয়, বরং ফলাফল উৎপাদনের পদ্ধতিকেও প্রভাবিত করে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র NDA বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার একটি বৃহত্তর রূপান্তরের দিকেই ইঙ্গিত করে, যেখানে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা এবং গণতান্ত্রিক ঘাটতির সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। সার্বভৌমত্ব তার আনুষ্ঠানিক রূপে অক্ষুণ্ণ থাকলেও, এর প্রকৃত সারবত্তা—উন্মুক্ততা, জবাবদিহিতা এবং জনমুখিতা—ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। অতএব, চ্যালেঞ্জটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির গোপন ধারাগুলো উন্মোচন করা নয়; বরং সেই নীতিমালাগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যার আলোকে এ ধরনের চুক্তি পরিচালিত হওয়া উচিত। অন্যথায়, গোপনীয়তা ব্যতিক্রম না হয়ে নিয়মে পরিণত হবে, এবং সার্বভৌমত্ব—নামে অক্ষুণ্ণ থাকলেও—তার গণতান্ত্রিক গভীরতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলবে। আগেই বলে নিয়েছি এটা একটা একাডেমিক আলোচনা- কারণ কেউ জানে না এ সম্পর্কে জনগণ কতটা কথা বলতে পারবে। যারা বলছেন তাঁরা ইনডেমনিটির আওতায় আছেন কিনা তাও জানা নাই।
লেখক- অধ্যাপক ড. এস কে দাস



