ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অবৈধ যুদ্ধ এমন এক জটিল কাঠামোকে উন্মোচিত করছে—যেখানে তেল, আর্থিক বাজার এবং ডলারের ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত—যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত।
প্রিয় বন্ধুরা,
Tricontinental: Institute for Social Research-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা।
আপনি-আমি যখন যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়ে নিজেদের পরিবার ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন বন্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের স্ক্রিনের সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে হিসাব কষছেন—অপার্থিব মনে হওয়া আর্থিক যন্ত্রগুলো ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের কাজ হলো ধনীদের সম্পদ রক্ষা করা। গত পঞ্চাশ বছরে মার্কিন ডলারের আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা—বিশেষ করে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে—আংশিকভাবে ‘পেট্রোডলার’ নামে পরিচিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছে।
যখন তেলের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে, তখন উৎপাদন ও পরিবহন খরচ পূর্বানুমানযোগ্য হয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়, এবং বন্ডসহ অন্যান্য আর্থিক সম্পদের দাম অস্থিরভাবে ওঠানামা করে না। এমন পরিস্থিতিতে ধনীরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের কাগুজে সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারে। ১৯৬০ সাল থেকে Organization of the Petroleum Exporting Countries (ওপেক) থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্ব তেলের বড় অংশ কীভাবে পরিবাহিত, মূল্য নির্ধারিত ও পরিশোধিত হবে—তা প্রভাবিত করে। এটি সম্ভব হয় সামরিক উপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণ, মিত্র রাষ্ট্র, এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। এমনকি অভ্যুত্থান ও যুদ্ধও ব্যবহার করা হয় সেইসব রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, যারা নিজেদের সম্পদের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ চায় বা ডলারকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে যেতে চায়।
মূল্যস্ফীতি—সময়ের সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়া—আর্থিক সম্পদের শত্রু, কারণ এটি ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতি তেলনির্ভর, তাই তেলের দাম বাড়লে প্রায় সব কিছুর দাম বাড়ে, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে, এবং বন্ডের মতো সম্পদের মূল্য কমে। ফলে ধনী বিনিয়োগকারীরা এমন নীতি সমর্থন করেন যা মূল্যস্ফীতি কমায়—যেমন মিতব্যয়িতা, কঠোর আর্থিক নীতি, এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন ডলার দীর্ঘদিন ধরে সম্পদ সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উৎপাদন কম খরচের দেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশে মজুরি ও মূল্যস্ফীতি কম রেখেছে এবং ডলারের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রেখেছে। যদিও বিভিন্ন সংকট এসেছে, তবুও সামরিক ক্ষমতা, নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের সক্ষমতা, জোটব্যবস্থা এবং গভীর আর্থিক বাজারের সমন্বয়ে এখনও কোনো মুদ্রাই ডলারের আধিপত্যকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি।
বর্তমানে বন্ড ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন, কারণ ইরান ইতিমধ্যে Strait of Hormuz প্রণালীতে চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এই পথ দিয়ে যায়। ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ অতিক্রম করেছে, যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ৫৩০ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক তেলবাজারের মোট মূল্য বছরে ২–৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থের বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়েছে। যদি এই প্রবাহে পরিবর্তন আসে—বিশেষত যদি ইউয়ানের মতো বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন বাড়ে—তবে তা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
মৌলিক ধারণাগুলো-
১. বন্ড কী?
বন্ড হলো এক ধরনের ঋণপত্র—একটি বেচাকেনাযোগ্য আর্থিক দলিল। এটি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট অর্থপ্রাপ্তির দাবির প্রতিনিধিত্ব করে। যখন কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান বন্ড ইস্যু করে, তখন বিনিয়োগকারী তাকে ঋণ দেয়। বিনিময়ে ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময় অন্তর সুদ (কুপন) দেয় এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে মূলধন ফেরত দেয়। বন্ড মূলত ভবিষ্যৎ আয় বা করের ওপর দাবি—অর্থাৎ এটি বাস্তব উৎপাদন সম্পদের মালিকানা নয়। অন্যদিকে শেয়ার কোম্পানির মালিকানার অংশ নির্দেশ করে। বন্ড তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু লাভও কম; শেয়ার ঝুঁকিপূর্ণ হলেও লাভের সম্ভাবনা বেশি।
২. বন্ড বাজার কী?
বন্ড বাজার হলো যেখানে সরকার ও প্রতিষ্ঠান বন্ড ইস্যু ও বেচাকেনা করে। এটি কোনো একক স্থান নয়; বরং New York, London, Tokyo, Hong Kong এবং Frankfurt-এর মতো বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে এটি পরিচালিত হয়। মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিশ্বে সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজে নগদায়নযোগ্য সম্পদগুলোর একটি। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পেনশন তহবিল, বীমা কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা এগুলো ধারণ করে।
৩. পেট্রোডলার ব্যবস্থা কী?
১৯৭৩–৭৪ সালের তেল সংকটের পর, বিশেষ করে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির মাধ্যমে, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য মূলত ডলারে নির্ধারিত হতে শুরু করে। ফলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোকে ডলার সংগ্রহ করতে হয় এবং রপ্তানিকারক দেশগুলো বিপুল ডলার সঞ্চয় করে। এই ডলারগুলো পুনরায় ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়—যা তেল বাজারকে আর্থিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ডলারের চাহিদা বজায় রাখে। এই ব্যবস্থাকে বলা যায় “তেল-ডলার-ওয়াল স্ট্রিট জটিলতা”। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করেছে—নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিরোধী দেশগুলোকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিয়ে।
৪. ডলারের বাইরে গেলে কী হবে?
যদি তেল আয়ের বড় অংশ ডলারে রাখা না হয়, তাহলে মার্কিন বন্ডের চাহিদা কমতে পারে, ঋণগ্রহণ ব্যয় বাড়তে পারে, এবং ডলারের মান কমতে পারে। তবে এটি ধীরে ধীরে ঘটবে এবং স্বল্পমেয়াদে অস্থিরতা বেশি দেখা যাবে।
৫. পেট্রোইউয়ান কী?
পেট্রোইউয়ান বলতে বোঝায় এমন তেল বাণিজ্য, যেখানে মূল্য নির্ধারণ ডলারে হলেও নিষ্পত্তি হয় চীনা ইউয়ানে। ২০১৮ সালে সাংহাইয়ে ইউয়ানভিত্তিক তেল ফিউচার চালুর পর এটি গুরুত্ব পায়। তবে ইউয়ান পুরোপুরি রূপান্তরযোগ্য নয় এবং চীনের আর্থিক ব্যবস্থা এখনও ডলারের মতো তরল নয়। ফলে পেট্রোইউয়ান এখনও বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের ছোট অংশ (প্রায় ৫% বা তার কম)।
উপসংহার-
উপরের আলোচনাগুলো বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ইউয়ানে তেল বাণিজ্যের সঙ্গে Strait of Hormuz দিয়ে নিরাপদ চলাচলকে যুক্ত করেছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করার একটি কৌশল। বিশ্ব তেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে পারে, পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে। যদিও এটি একাই পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করবে না, তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তা উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করবে।
লেখক- বিজয় প্রসাদ
[ খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। Tricontinental: Institute for Social Research এর ডিরেক্টর ] অনুবাদক, ড. সুশান্ত কুমার দাস



