প্রতিদিন যে কোন ধরণের মিডিয়া খুললেই চোখে পড়বে কোন না কোন ‘অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা’ র খবর। এখন গ্রামের চা এর দোকান বা বিকালের আড্ডাতেও শুল্ক নামক শব্দটি আলোচনায় আসে। আম জনতা অর্থনীতির মহাসমুদ্রের মধ্যে না গিয়েও বোঝে এটা তাদের পেটে লাথি মারবে। একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে দেখা যাক, আসলে এই আজব বিষয়টা কি।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার রক্ষা বা ভূরাজনৈতিক চাপের একটি মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এটা আর কারুর অজানা নয় যে, বাস্তবে এটি এখন বিশ্বশক্তির প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটা এখন বলা যায়, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাম্রাজ্যবাদের একটি নতুন রূপ। রূপ বদলেছে, কিন্তু ভেতরের কাঠামো ও উদ্দেশ্য একই রয়ে গেছে। এক সময় সরাসরি উপনিবেশ স্থাপন ছিল শাসনের প্রধান উপায়। পরে আসে নয়া-ঔপনিবেশিক নির্ভরতা। আবার কোথাও সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপও হয়েছে। এখন সেই জায়গায় প্রধানতঃ এসেছে আর্থিক পুঁজিবাদ ও নয়া উদারনৈতিক বিশ্বায়ন। শাসনের ধরন বদলেছে। কিন্তু মূল লক্ষ্য একই—অসাম্য ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে পুঁজি সঞ্চয় বাড়ানো এবং তা ধরে রাখা।
উনিশ ও বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সরাসরি উপনিবেশ শাসন করত। উপনিবেশগুলো থেকে তারা কাঁচামাল নিত, সস্তা শ্রম পেত এবং নিজেদের পণ্যের বাজার তৈরি করত। আমরা দু’শ বছর ইংরেজ উপনিবেশ ছিলাম। লেনিন তাঁর Imperialism: The Highest Stage of Capitalism গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, এই পর্যায়ে পুঁজি কেন্দ্রীভূত হয়, শুধু পণ্য নয় পুঁজিও বিদেশে রপ্তানি হয়, এবং বড় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে বিশ্বকে ভাগ করে নেয়। তখন সরাসরি রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।
১৯৪৫ সালের পর আনুষ্ঠানিক উপনিবেশ শাসন কমে আসে। তবে ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার মতো দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখায় যে, সামরিক হস্তক্ষেপও শেষ হয়নি। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলতে থাকে ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে—যেমন আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক। ডলারের আধিপত্য এবং সামরিক জোটও এই নিয়ন্ত্রণের অংশ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রধান শক্তি হিসেবে উঠে আসে এবং পুরোনো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর জায়গা নেয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি চাপিয়ে দেওয়া, ১৯৭৩ সালে চিলিতে হস্তক্ষেপ, কিউবার ওপর নিষেধাজ্ঞা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় হস্তক্ষেপ—এসব তার উদাহরণ।
আজকের দিনে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয় বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। যেমন—SWIFT পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, ডলারভিত্তিক লেনদেনের প্রাধান্য, তৃতীয় দেশকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা, এবং সম্পদ জব্দ করা। এখন আর সরাসরি দখল নয়; বরং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রভাব খাটানো হয়। ইরানের তেল রপ্তানি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাধা, ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা, এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা—এসব সাম্প্রতিক উদাহরণ। এখানে আসল শক্তি হলো বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ।
গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনও কাঠামোগতভাবে নির্ভরশীল। তারা কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভর করে, ঋণের ফাঁদে পড়ে, মুদ্রার দুর্বলতায় ভোগে এবং প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকে। নিষেধাজ্ঞা এই বৈষম্য আরও বাড়ায়। এতে দেশের স্বাধীন উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। মুদ্রাস্ফীতি ও সামাজিক সংকট গভীর হয়। ইরানে ওষুধের সংকট এবং ভেনেজুয়েলায় অতিমাত্রার মুদ্রাস্ফীতি তার উদাহরণ। সেখানে নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান নির্ভরতার কাঠামোকে আরও শক্ত করে। এখন আর্থিক সার্বভৌমত্ব একটি নতুন বৈশ্বিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু দেশ ডলার নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নিচ্ছে। যেমন ব্রিকস দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলছে। দ্বিপাক্ষিক মুদ্রা বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে। বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এগুলো আর্থিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের লক্ষণ।
তবে সাম্রাজ্যবাদ একক ও একরকম নয়। এর ভেতরেও দ্বন্দ্ব আছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে মতভেদ তৈরি করেছে। জার্মানির নর্ড স্ট্রিম জ্বালানি সংকট এবং শিল্প প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এই টানাপোড়েনের উদাহরণ। অনেক সময় ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব। চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা দেখায় যে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও সেমিকন্ডাক্টর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চলছে। সরবরাহ শৃঙ্খলও ভেঙে যাচ্ছে। এতে এক ধরনের নতুন শীতল যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
কার্ল মার্কস বলেছিলেন, পুঁজিবাদের মূল দ্বন্দ্ব হলো সামাজিক উৎপাদন ও ব্যক্তিগত মালিকানার মধ্যে সংঘাত। আজ উৎপাদন বিশ্বব্যাপী একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মালিকানা অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত। নিষেধাজ্ঞা এই বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করে। এতে বোঝা যায়, বৈশ্বিক সংযোগ কতটা ভঙ্গুর। অর্থনৈতিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুঁজিবাদ উৎপাদনকে বিশ্বজুড়ে ছড়ায়, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতাকে খণ্ডিত রাখে। নিষেধাজ্ঞা এক ধরনের অ-সামরিক যুদ্ধ। এটি অর্থনৈতিক অবরোধ, আর্থিক অবরোধ এবং মুদ্রাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। সরাসরি সামরিক দখলের মতো নয়। কিন্তু এর ক্ষতি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলো এটিকে আইনগত ও নৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করে। এতে তাদের দেশে রাজনৈতিক বিরোধিতা কম হয়। তাই একে “নিম্নমাত্রার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ” বলা যায়।
ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন থেকে নব-ঔপনিবেশিক নির্ভরতা, এবং এখন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা—এটি এক ধরনের ধারাবাহিক রূপান্তর। ভেতরের সারবস্তু একই। তা হলো উদ্বৃত্ত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, বৈশ্বিক শ্রেণিবিন্যাস বজায় রাখা, এবং স্বাধীন উন্নয়নের পথ বন্ধ করা। নিষেধাজ্ঞা কোনো আকস্মিক পদক্ষেপ নয়। এটি বর্তমান পর্যায়ের আর্থিক পুঁজিবাদের কাঠামোগত প্রকাশ। আজ সরাসরি উপনিবেশ স্থাপন রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় অথবা বেশি ঝুঁকির। তাই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাম্রাজ্যিক শক্তির নতুন হাতিয়ার। এটি আর্থিক পুঁজির আধিপত্য, মুদ্রা ব্যবস্থার অস্ত্রায়ন এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে বহু-মেরুকেন্দ্রিক উদ্যোগ এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান সময় চিহ্নিত হচ্ছে উত্তর–দক্ষিণ বৈষম্য, উন্নত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নব্য উদারনৈতিক বিশ্বায়নের সংকট, এবং নতুন বহুমেরু আর্থিক ব্যবস্থার উত্থানে। অতএব, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শুধু পররাষ্ট্রনীতির একটি উপায় নয়। এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের সমকালীন রূপ। আমাদের দেশেও সাম্প্রতিক কালে বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে। আরো হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোকে উপরের আলোকে দেখলে অনেক সত্য সহজ হবে বলেই মনে হয়।
লেখক- অধ্যাপক ড. সুশান্ত দাস



