ইরানের সংকট : অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক : পশ্চিমা গনতন্ত্র বনাম শিয়াপন্থী শরীয়া গনতন্ত্র : ইরানের ঔপনিবেশিক অতীত বর্তমান সংকটে জেগে উঠছে : মানুষের অর্থনৈতিক সংকট ও বিদ্রোহ : রাষ্ট্রীয় গণহত্যা বনাম সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরোধিতা : ইরান কোনো সহজ প্রশ্ন নয়: উত্তরও বহুমুখী : ইরানের জনগণের মুক্তি কোন পথে নাকি রক্তের পরিমাণ আরও বাড়বে! /?
সর্বশেষ খবরে দেখা গেছে ইরানের জনগণ খাদ্য, পানীয় ও পরিষেবার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। মুদ্রার দাম পড়ে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় মানুষ রাস্তায় নেমে পড়তে বাধ্য হয় এবং তা সহিংস রূপ লাভ করে। তারপর সরকারি দমন-পীড়ন এবং নির্বিচারে গুলি। নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। সরকারি বাহিনীর প্রায় শতাধিক নিহত। জনগণের নিহত হওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্র তেমন সহানুভূতিশীল নয়, তারা জানাজা পড়ছে নিহত সরকারি বাহিনীর সদস্যদের। আন্দোলনকারীদের মিডিয়া বলল, গনতন্ত্রকামী, সরকার উচ্ছেদের দাবি। অন্যদিকে সরকার বলছে, আন্দোলনকারীরা পশ্চিমা গনতন্ত্রের শ্লোগানের অন্তরালে দেশের শত্রু। আন্দোলনকারীদের বরাতে বলা হচ্ছে তারা আয়াতুল্লাহ খামেনির উচ্ছেদ চান। গনতন্ত্রের দাবির পেছন পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন, গনতন্ত্রকামীদের সমর্থনে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন। অর্থাৎ, ইরানে দ্বিতীয় বারের মতো হামলার প্রস্তুতি চলছে। ইরানও যুদ্ধের হুমকির পাশাপাশি আলোচনার পথ খোলা রেখেছে।
মধ্যপ্রাচ্য গত এক বছরের অধিক যুদ্ধের মধ্যে আছে। ইজরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মাত্র থেমেছে। এই যুদ্ধই ইরানের অর্থনৈতিক দূর্দশার মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের পরিকল্পনা অর্থনৈতিক দূর্দশা মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করবে আর গনতন্ত্রের পতাকা নিয়ে তারা রেজিম চেইঞ্জ করবে। ট্রাম্প পরিস্কার করে সেই কথাই বললেন। ইরানের সংকটের কারণ এবং ফলাফল এত সহজে অনুধাবন করা যাবে না। কারণ ইরান একটা দেশ নয় একটা সভ্যতা। আর সেই সভ্যতা জিগজাগ করে চলছে। আধুনিক সময়ে তা মনে রাখতে হবে। বৃটিশ এবং ফ্রান্স প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইরানের ভাগ্য নির্ধারণ দেয়। রাজতন্ত্র বসিয়ে দেয় তারা। পাহলভিরা সাম্রাজ্যবাদের অনুগত। এরপর গনতন্ত্র আসে মোসাদ্দেকের হাত ধরে পঞ্চাশের দশকে। তিনি তেল জাতীয়করণ করেন।বৃটিশ ও মার্কীন তেল কোম্পানির মুনাফায় কোপ বসান। তার প্রতিশোধে সিআইএ মোসাদ্দেককে ক্যূ এর মাধ্যমে উচ্ছেদ করে। তারপর আবার পাহলভি পরিবার।
জনগণের অর্থনৈতিক দূর্দশা আবার গনতন্ত্রের জন্য তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। ১৯৭৯ সালে ইরানের এই বিপ্লব গনতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসেন খোমেনির শিয়া শরিয়াপন্তীরা। তারা ক্ষমতা সংহত করার জন্য আন্দোলনে অংশ নেওয়া গনতান্ত্রিক শক্তি যেমন মোসাদ্দেকপন্থী ও রাশিয়াপন্থী তুদেহ পার্টির নেতা কর্মীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। ইরানের বিপ্লবের গনতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ফুকোর দার্শনিককেও আকর্ষণ করেছিল। যাইহোক, ইরান এগিয়ে গেলো ধনে মানে। এরপর ইরান বিপ্লব রপ্তানিতে যুক্ত হলো।ইজরায়লের বিরুদ্ধে হিজবল্লাহ বাহিনী তৈরি করে। ইজরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব ইরানকে ঘিরে ফেললো। সৌদি আরব সহ সুন্নী রাষ্ট্রগুলো শিয়াপন্থী ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বলয়ের সাথে মিশে যায়। এইসব ইতিহাসের পাশাপাশি মনে রাখতে হবে ইরান বহুজাতির দেশ। কুর্দি এবং আফগান সীমান্তে বসবাসকারীরা ফারসী ইরানীদের প্রতিপক্ষ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে কুর্দি ও পশতু সব এক হয়ে যায়। তেহরানের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হলো, এইসব গোষ্ঠীর সাথে বৈরিতা, মরাল পুলিশের বাড়াবাড়ি এবং প্রবাসী ইরানীয়দের সমর্থন না পাওয়া। ইরানের আরও বড় দূর্বলতা হলো মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে না পারা। মানুষের যখন পেটে ভাত ছিল তখন হিজাব ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু নারীদের কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, আর্থিক দূর্দশা সরকারের নজরে পড়ে না, নজরে পড়ে হিজাববিহীন মাথা। এতে বিক্ষোভ জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন গনতন্ত্রের দাবি বেশ সবল। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, ইরারায়েল ও পশ্চিমে বসবাসরত ইরানিদের একটা ন্যাক্সাস গড়ে ওঠে। তাতে নোবেলজয়ীরা যুক্ত হয়।
তাহলে ইরানের সামনে গনতন্ত্রের দাবি নিয়ে বিক্ষোভরত জনগণ এবং যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে অন্য দিকে তাদের সার্বভৌমত্ব। ১৯৮৯ সালে তিয়েনমান স্কোয়ারের বিদ্রোহ চীন শক্ত হাতে দমন করেছিল। চীন বড় দেশ। ইরান কি পারবে? কারণ ইরান বেশ দূর্বল দেশ এখন। অর্থনৈতিকভাবে চাপে আছে। ঘরে বাইরে শত্রু। এখন বিশ্ব মতামতও বিভক্ত। রাশিয়া ইরানের পক্ষে। চীনও আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়া। এই পরিস্থিতিতে গনতন্ত্রকামীদের দাবি যদি রেজিম চেইঞ্জ হয় তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষে। আর ইরানের রেজিমকে সমর্থন না করে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করা যাবে না। আবার ইরানের জনগণও বিভক্ত।
এই জটিল পরিস্থিতিতে রাজনীতির হাতে মানুষের অর্থনৈতিক দূর্দশা থেকে মুক্তি এবং জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম অনেক লম্বা পথ নেবে মনে হয়। এই পথ হবে রক্তাক্ত। ট্রাম্প যদি যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তবে তা হবে পশ্চিমা গনতন্ত্রের নামে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। পরিস্থিতি বেশ জটিল।
লেখক- শরিফ শমশির
লেখক ও গবেষক


