প্রচ্ছদসম্পাদকীয়মুক্তমতট্রাম্পের মুখে হিটলারের প্রতিধ্বনি  

ট্রাম্পের মুখে হিটলারের প্রতিধ্বনি  

বাংলাদেশে তেলের পাম্পে তেল নিয়ে সংঘর্ষের  প্রায় বর্বরোচিত দৃশ্য প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ যেন বুভুক্ষু জনতার খাবারের অভাবে আহাজারি। দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে তার কোন তীব্র অশনিবার্তা নাই। একটি সংসদীয় অধিবেশন চলছে, সেখানেও হেলদোল কিছু  আছে, তেমন দাবী কেউ করতে পারবে না। আমাদের সঙ্গে ট্রাম্প সাহেবের চুক্তি নিয়ে যারা সরব, তাঁদের গায়ের তেমন জোর নাই, তাই কেউ গ্রাহ্য করে না।  যেন রোম পোড়ে, নিরো বাঁশি বাজায় অবস্থা। রাশিয়া থেকে তেল কেনার মার্কিনী অনুমতি মিলেছে এই উল্লাসও  দেখা যাচ্ছে অনেকের মধ্যে। আমাদের অবস্থা এর থেকে বেশি বলাটা কতটা আইনবিরোধী তাও বোঝা মুস্কিল। এই দোলাচলে  মাঝেই  শুনি অন্য এক প্রতিধ্বনি। ট্রাম্পের আস্ফালন, গোটা পৃথিবীর কাছেই অতি প্রাসঙ্গিক।
রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাষা প্রায়শই সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে গভীর আদর্শিক ধারণাকে প্রকাশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন রাজনৈতিক নেতা প্রেসিডেন্ট  Donald Trump-এর কিছু মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উত্থাপন করেছে। ইরানকে “পশ্চাৎপদ” বা “আদিম” সভ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করার মতো বক্তব্য ইতিহাসবিদ, কূটনীতিক ও জনবুদ্ধিজীবীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাঁদের মতে, এই ধরনের ভাষা কেবল ইতিহাসকে বিকৃতই করে না, বরং আন্তর্জাতিক সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
আধুনিক ভূরাজনীতি কেবল সেনাবাহিনী, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। এটি নির্ধারিত হয় ভাষা ও বর্ণনার মাধ্যমে।
রাজনৈতিক বর্ণনা নির্মাণ করে—
কারা বন্ধু, কারা শত্রু;
কারা সভ্য, কারা বর্বর;
কারা উন্নত, কারা পশ্চাৎপদ।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তা এই সত্যকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ইরানকে “পাথর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া” ধরনের মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা পাল্টা বলেন, হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এক সভ্যতাকে অবজ্ঞা করা শক্তির নয়, বরং অজ্ঞতার পরিচয়।
এই বিতর্ক কেবল দুই রাষ্ট্রের সংঘাত নয়; এটি আসলে সভ্যতা ও ক্ষমতা নিয়ে দুটি ভিন্ন বর্ণনার সংঘর্ষ।
ইরানের উপর সামরিক আগ্রাসন বাড়িয়ে তোলার আস্ফালনে বর্তমান ইরানকে  ধ্বংস করে দেবার বাগাড়ম্বর করতে গিয়ে ইরানের প্রাচীন সভ্যতাকে কটাক্ষ করে ইরানের অতীত সভ্যতাকেও “আদিম” বলে বর্ণনা করেছে  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটা স্পষ্টতঃই গত শতাব্দির তিরিশের দশকে দেওয়া জার্মান একনায়ক হিটলারের বিভিন্ন বক্তব্যের অবিকল প্রতিধ্বনি। ইতিহাসের আলোকে কোন সভ্যতাকে অবজ্ঞা করা বা হীন প্রতিপন্ন করা শুধু সম্পূর্ণ অসংগত নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ ।  ইরানের জনগনের আছে হাজার হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস।
প্রাচীন পারস্য সভ্যতা—যার সঙ্গে যুক্ত ছিল
Achaemenid Empire,
Parthian Empire এবং
Sasanian Empire—
যারা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি ছিল।
এই সভ্যতার অবদান বহুমাত্রিক:
• উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থা
• বিশাল যোগাযোগ ও সড়ক নেটওয়ার্ক
• জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতে অগ্রগতি
• সাহিত্য ও দর্শনের ঐতিহ্য
• পূর্ব ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন
পারস্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন Cyrus Cylinder-কে অনেক ইতিহাসবিদ মানবাধিকারের প্রাথমিক দলিলগুলির একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।
অতএব ইরানকে “আদিম সভ্যতা” বলে অভিহিত করা ইতিহাসগত সত্য নয়; বরং তা রাজনৈতিক ভাষার নতুন নির্মাণ, যা নতুন কিছুর অশনিসংকেত।
ইরানকে ঘিরে এই ভাষাগত উত্তেজনাকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইরান বিশ্বশক্তির দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকারকে উৎখাত করার ঘটনাটি ইরান-মার্কিন সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গভীর মোড় সৃষ্টি করে।
পরবর্তী ঘটনাবলি এই সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে:
• ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব
• ইরান-ইরাক যুদ্ধ
• দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
• পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ
এই প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল
Joint Comprehensive Plan of Action।
কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়।
লক্ষ লক্ষ মার্কিনী জনগণ রাস্তায় নেমে ট্রাম্পের এই সভ্যতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে।  বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও নীতিবিশ্লেষক Jeffrey Sachs সহ বহু মার্কিন বুদ্ধিজীবি ও রাজনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই  নীতির অন্যতম কড়া সমালোচক।
স্যাক্স সংগত ভাবেই মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক সংঘাতই বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বারবার সতর্ক করেছেন যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক সময় সামরিক শক্তির অহংকার বাস্তব ভূরাজনৈতিক জটিলতাকে উপেক্ষা করে। তিনি বারবার বলেছেন,
১. ইরান হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি সভ্যতা; বাহ্যিক চাপ দিয়ে তাকে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।
২. সামরিক সংঘাত ইরাক যুদ্ধের মতো বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
৩. আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান কেবল কূটনীতি ও সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্ভব।
স্যাক্স ছাড়াও বহু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, উস্কানিমূলক ভাষা প্রায়ই রাজনৈতিক উত্তেজনাকে সামরিক সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়।
শত্রুকে সাংস্কৃতিকভাবে নিকৃষ্ট হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা ইতিহাসে নতুন নয়। বিশ শতকে জার্মানির শাসক Adolf Hitler-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা Nazism এই ধরনের বক্তৃতাকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিল। নাজি মতাদর্শে বিশ্বরাজনীতি ছিল “উন্নত” ও “নিকৃষ্ট” জাতির মধ্যকার সংগ্রাম। যদিও সমকালীন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সরাসরি সেই ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করা সতর্কতার দাবি রাখে, তবুও গবেষকেরা লক্ষ্য করেন—রেটোরিকের কাঠামোতে কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়।
এই ধরনের বক্তৃতায় সাধারণত তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকে:
• শত্রুকে সাংস্কৃতিকভাবে নিকৃষ্ট বলে চিত্রিত করা
• নিজের সভ্যতাকে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করা
• রাজনৈতিক সংঘাতকে অস্তিত্বগত সভ্যতার যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা
এতে কূটনৈতিক সমঝোতার ও শান্তির পথ সংকুচিত হয়ে যায়।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্ব ও যুদ্ধ এড়ানোর নীতি। এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে United Nations। কিন্তু যখন বৃহৎ শক্তিগুলো একতরফাভাবে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন সেই আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
দর্শনের দৃষ্টিতে সভ্যতাকে শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে দেখা ইতিহাসের বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
জার্মান দার্শনিক Friedrich Engels তার অনেক গ্রন্থতে দেখিয়েছিলেন যে সভ্যতা বিকশিত হয় বিভিন্ন সংস্কৃতির পারস্পরিক ক্রিয়া ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে।
বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ইতিহাসই তার প্রমাণ:
• গ্রিক দর্শন সংরক্ষণ করেছিলেন ইসলামী পণ্ডিতরা
• পারস্যের গণিত মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছে
• ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি ইউরোপীয় গণিতকে রূপান্তরিত করেছে
• চীনা প্রযুক্তি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন পথে নিয়ে গেছে
অতএব আধুনিক মানবসভ্যতা কোনো একক সংস্কৃতির সৃষ্টি নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত সৃষ্টিকর্ম।
সভ্যতাগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কয়েকটি গুরুতর বিপদ সৃষ্টি করে।
প্রথমত, এটি ইতিহাসকে বিকৃত করে।
দ্বিতীয়ত, এটি রাজনৈতিক উত্তেজনাকে সামরিক সংঘাতে রূপ দিতে পারে।
তৃতীয়ত, এটি আলোচনার সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে।
পারমাণবিক যুগে এই ধরনের মনোভাব মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমান বিশ্ব ক্রমশ বহুপাক্ষিক  হয়ে উঠছে। রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা  এবং অন্যান্য শক্তির উত্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্যকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, প্রযুক্তিগত অসমতা ও পারমাণবিক অস্ত্রের মতো বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমগ্র মানবজাতির সহযোগিতামূলক কূটনীতি—এক ধরনের বৈশ্বিক চেতনা।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার শেষ পর্যন্ত মানবতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্য সভ্যতাকে অবমাননা করে, তখন তারা অজান্তেই সেই ধ্বংসাত্মক ঐতিহাসিক ধারা পুনরুজ্জীবিত করে যা একসময় বিশ্বকে মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অতএব বর্তমান যুগে প্রয়োজন সতর্কতা, বোধ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই উপলব্ধির ওপর যে—
কোনো সভ্যতা একা নয়;
আমরা সবাই ইতিহাসের এক অভিন্ন ধারার অংশ।
পারস্পরিক সম্মান, ঐতিহাসিক সচেতনতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতেই কেবল মানবজাতি ধ্বংসের চক্র থেকে মুক্ত হতে পারে।
লেখক- অধ্যাপক ড. এস কে দাস

সর্বশেষ