ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কি ডলারের আধিপত্যের অবসান ঘটাবে?
ভূমিকা:
বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা প্রায় আট দশক ধরে একটি প্রধান স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে—যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের আধিপত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ডলার ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান লেনদেনের মাধ্যম, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের মূল ভাণ্ডার এবং বিশ্ব আর্থিক বাজারের কেন্দ্রীয় একক হিসেবে ডলার দীর্ঘদিন ধরে এক প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু আজকের আন্তর্জাতিক পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হচ্ছে, নতুন অর্থনৈতিক জোটের উত্থান ঘটছে এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বিশ্ব অর্থব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা একটি নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কি ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যকে দুর্বল করে দিতে পারে? কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধ পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে আঘাত করতে পারে এবং দেশগুলোকে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। অন্যদিকে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে ইতিহাসে দেখা গেছে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বরং ডলারকে আরও শক্তিশালী করে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আসে:
স্বল্পমেয়াদে ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ডলারের আধিপত্য ভাঙতে পারবে না, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি বহুমুখী আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
ডলারের কাঠামোগত শক্তি:
ডলারের স্থায়িত্ব বুঝতে হলে প্রথমে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর কাঠামোগত ভিত্তিগুলো বুঝতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রায় ৫৬–৫৮ শতাংশ এখনো মার্কিন ডলারে সংরক্ষিত। তুলনায় ইউরোর অংশ প্রায় ২০ শতাংশ, আর চীনের রেনমিনবি বা ইউয়ানের অংশ ৩ শতাংশেরও কম। ডলারের প্রভাব শুধু রিজার্ভে সীমাবদ্ধ নয়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে—প্রায় ৮০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন ডলারে সম্পন্ন হয়। প্রায় অর্ধেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন ডলারে মূল্যায়িত হয়। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের প্রায় ৯০ শতাংশের একটি অংশ হিসেবে ডলার ব্যবহৃত হয়। এই আধিপত্যের পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজার পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ও তরল বাজার। বিশেষ করে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বাজারের আকার প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করে।
তৃতীয়ত, মুদ্রা ব্যবস্থায় একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক প্রভাব কাজ করে। যখন একটি মুদ্রা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা থেকে সরে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তি ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করে। এই কারণগুলোর ফলে ডলারকে দ্রুত প্রতিস্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন।
যুদ্ধ ও নিরাপদ মুদ্রার প্রভাব:
একটি আকর্ষণীয় বাস্তবতা হলো—ভূরাজনৈতিক সংঘাত প্রায়ই ডলারকে দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করে। যখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে, তখন বিনিয়োগকারীরা এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন যা নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং সহজে লেনদেনযোগ্য। মার্কিন ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ইরান–ইসরায়েল উত্তেজনার সময় সাম্প্রতিক আর্থিক বাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ার সাথে সাথে বিনিয়োগকারীরা ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকেছেন। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট কিংবা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। অর্থাৎ, বৈশ্বিক অস্থিরতা প্রায়ই ডলারকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে সামনে আনে:
বিশ্বে অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, ডলার ততই নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটা যেন একটা সাধারণ মিথ এ পরিণত হয়েছে। যেটাকে, নয়া উদারনীতিবাদ ব্যবহার করে তাদের আর্থিক আধিপত্যকে আরো মজবুত করতে এবং তা করে।
আর্থিক ব্যবস্থার অস্ত্রীকরণ:
তবে ডলারের শক্তি একই সঙ্গে একটি নতুন সমস্যাও সৃষ্টি করেছে। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমবর্ধমানভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করেছে। ইরান, রাশিয়া এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাকে কার্যত একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। এই ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল কৌশলগত ক্ষমতা দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে অন্য দেশগুলোকে ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর প্রণোদনাও সৃষ্টি করে।
উদাহরণস্বরূপ—
রাশিয়া তার মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
চীন নিজস্ব আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা CIPS চালু করেছে।
বিভিন্ন দেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার শুরু করেছে
বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ হওয়ার ঘটনা অনেক দেশকে ডলার নির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
ফলে বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় ধীরে ধীরে রিজার্ভ বৈচিত্র্যকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ব্রিকস জোটের চ্যালেঞ্জ:
উদীয়মান অর্থনীতির উত্থানও বিশ্ব মুদ্রা ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত ব্রিকস জোট এবং এর সম্প্রসারিত সদস্যরা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে এই জোট বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রতিনিধিত্ব করে।
এই জোটের মধ্যে ক্রমবর্ধমানভাবে আলোচনা হচ্ছে—
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার
বিকল্প আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা
সম্ভাব্য একটি ব্রিকস নিষ্পত্তি মুদ্রা।
যদিও এসব উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও এগুলো পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমানোর একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
জ্বালানি বাজার ও পেট্রোডলার:
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে আনে—পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
১৯৭০-এর দশক থেকে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের অধিকাংশই ডলারে মূল্যায়িত হয়েছে। যেহেতু তেল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্য, তাই পেট্রোডলার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ডলারের চাহিদা বজায় রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চীন সাংহাই এনার্জি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ইউয়ানে তেল বাণিজ্য উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইরান নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি অংশ ডলারের বাইরে পরিচালনা করছে। যদি ভূরাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়, তবে ভবিষ্যতে জ্বালানি বাজার একাধিক মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। তবে এই পরিবর্তন অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ডলারের বিকল্পের সীমাবদ্ধতা:
ডলারের বিকল্প হিসেবে সম্ভাব্য মুদ্রাগুলোরও উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ইউরো গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও আর্থিক কাঠামোর কিছু দুর্বলতা রয়েছে।
অন্যদিকে চীনের ইউয়ান আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত প্রসারিত হলেও চীনের কঠোর মূলধন নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত আর্থিক স্বচ্ছতা অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে সতর্কতা সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মার্কিন ট্রেজারি বাজারের মতো গভীর ও তরল বাজার বর্তমানে অন্য কোনো মুদ্রার পেছনে নেই।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট হলো—একটি বহুমুখী আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা।
বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থার উদ্ভব:
বিভিন্ন প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব অর্থব্যবস্থা ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণ রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরো ও ইউয়ানের মতো আঞ্চলিক মুদ্রাগুলোর ভূমিকা বাড়ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিও ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা এবং নতুন আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক লেনদেনের কাঠামোকে পরিবর্তন করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ডলার হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হিসেবেই থাকবে, কিন্তু এর অংশ ধীরে ধীরে কমতে পারে।
উপসংহার:
ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত মূলত একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে নতুন রূপ দিচ্ছে। তবে একটি যুদ্ধ হঠাৎ করে ডলারের আধিপত্য ভেঙে দিতে পারবে—এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ- এটা অতি আশাবাদ হতে পারে। কিন্তু, এই প্রবনতা এখন বাস্তব এটাকেও উপেক্ষা করা যাবে না। বৈশ্বিক প্রান্তিক দেশগুলোর জন্য এখনই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প ভাবতে হবে। তা না হলে, সংকটকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী মুদ্রাব্যবস্থা আরও শ্বাসরুদ্ধকর মুষ্টি সংকুচিত করবে। তাই,স্বল্পমেয়াদে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বরং ডলারকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার, অর্থনৈতিক শক্তির পরিবর্তন এবং নতুন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার বিকাশ বিশ্ব মুদ্রা ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে পারে। সর্বোপরি, ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালীতে তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় ইউয়ান ব্যবহার করার ঘোষণা বৈশ্বিক তেল ব্যবসায় নতুন উপাদান সংযুক্ত করবে সন্দেহ নেই। সম্ভবত ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থব্যবস্থা এমন একটি রূপ নেবে যেখানে একক মুদ্রার আধিপত্যের পরিবর্তে কয়েকটি শক্তিশালী মুদ্রা যৌথভাবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে পরিচালনা করবে।
সুতরাং প্রকৃত প্রশ্নটি হয়তো এই নয় যে ডলার কখন পতিত হবে, বরং এই—যে, একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে পুনর্বিন্যস্ত হবে।
লেখক- অধ্যাপক ড. এস কে দাস


