29 C
Dhaka
শনিবার, মে ১৫, ২০২১

অনলাইন টিভি

Bangladesh
779,535
কোভিড-১৯ সর্বমোট আক্রান্ত
Updated on May 15, 2021 3:50 AM
Homeসম্পাদকীয়মুক্তমতখাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড : বীর শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড : বীর শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

।। শংকর কুমার মল্লিক ।। 

বছর খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ৭১তম দিবস। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় দুটি রাষ্ট্র। ভারত ও পাকিস্তান। অর্থাৎ স্বাধীন দুটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটে। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করে এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। কখনো সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন, কখনো নিরস্ত্র অহিংস আন্দোলন, কখনো বৃটিশ শাসকদের সাথে আলাপ আলোচনা, কখনো আইন অমান্য আন্দোলন, কখনো অসহযোগ আন্দোলনের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এ স্বাধীনতা এসেছে। এর ফলে অখণ্ড ভারতবর্ষ দু-খণ্ডে বিভক্ত হলো। সে বিভক্তির মানদণ্ড ছিল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নেতাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও মিলনের ফল এটি। দ্বন্দ্ব ক্ষমতার এবং মিলন স্বার্থে।
সাতচল্লিশের দেশভাগের চার বছর আগে ১৯৪৩ সালে ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। সে সময় চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তারই কারণে কৃত্রিম খাদ্য সংকটের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল দুর্ভিক্ষের। তার আগে থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় কৃষক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলা অঞ্চল তার বাইরে ছিল না। ১৯৪০ সালে যশোরের পাঁজিয়ায় এবং ১৯৪৬ সালে তৎকালীন খুলনা জেলার মৌভোগে অনুষ্ঠিত সারা বাংলা কৃষক সম্মেলনে সে আন্দোলন আরও ব্যাপকভাবে করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র বাংলা অঞ্চল জুড়ে শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন। ১৯৪৬ সালে দেশভাগের আগের বছর এ আন্দোলন ব্যাপক রূপ নেয়। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, রংপুর থেকে শুরু করে পশ্চিমে মেদিনীপুর, বর্ধমান, হুগলি নদীয়া, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, পাবনা, যশোর, খুলনা থেকে  দক্ষিণের সুন্দরবনের কাকদ্বীপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এ আন্দোলন। তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির নেতৃত্বে এ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই এটি ছিল শ্রেণি –  আন্দোলন। একদিকে কৃষক সমাজ অন্যদিকে জমিদার, জোতদার ও নানামাত্রিক ভূস্বামী। এই জমিদার জোতদাররা ছিলেন কংগ্রেস অথবা মুসলিম লীগের নেতাকর্মী অথবা সমর্থক। তাদের বক্তব্য ছিল দেশ স্বাধীন হলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগের নেতারা এ কথা বলে এবং নানারকম অত্যাচার জুলুমের মাধ্যমে আন্দোলন স্তিমিত করতে চেয়েছিল। এবং তাতে তারা সফলও হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বুঝতে দেরি হয়নি বৃটিশ শাসনের পর পাকিস্তানি নব্য শাসন শোষণের মধ্যে পড়েছে জনগণ। ফলে স্বাধীনতার আগে চলা তেভাগা, টঙ্কপ্রথা উচ্ছেদ, নানকার অবসান প্রভৃতি আন্দোলন সংগ্রামের সাথে যুক্ত হয়েছিল আরও নানা আন্দোলন। ১৯৪৯ সালে খাদ্যের দাবী,মজুরি বৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবীতে রেল, কাপড়ের মিল ও চা – বাগানের শ্রমিক ও সরকারি নিম্নস্তরের কর্মচারীরা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে। ওই সময় নব্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা অজুহাতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে কারাগারে আবদ্ধ করে রাখে। শুধু গ্রেফতার করে কাজ শেষ করেনি। তাদের ওপর চালিয়েছিলো সীমাহীন অত্যাচার। জেলখানায় রাজবন্দিদের ওপর প্রচন্ড দমন-পীড়ন এমনকি শারীরিক মানসিক নির্যাতন চলতো। তারই ফলে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে সামন্তবাদী শোষণের অবসান এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবীতে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রায় শতাধিক মানুষ শহিদ হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন কারাগারে আটক রাজবন্দী এবং অন্যান্য বন্দীরা তাদের বিভিন্ন দাবীতে কারাগারে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের রাজবন্দিদের আন্দোলনের কারণে তাদের ওপর নির্মমভাবে  গুলি চালানো হয়।
১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল সেদিন ছিল সোমবার। অন্য দিনের মতো খাপড়া ওয়ার্ডের রাজবন্দীরা সকালে নিজেদের নানা কাজে ব্যস্ত। কেউ সকালের নাস্তা খাচ্ছেন, কেউ কেউ আলাপ আলোচনা করছেন। কয়েকজন একসাথে বসে আলোচনায় মশগুল কিভাবে জেল কর্তৃপক্ষকে মোকাবিলা করা যায়। ৩০/৩২ জন রাজবন্দী সেদিন ছিলেন খাপড়া ওয়ার্ডে। তারা ভীষণ ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত। সকাল ৯ টার দিকে জেল সুপার ডব্লিউ এফ বিল, জেলার আব্দুল মান্নান, জেলের ডাক্তার, দু’জন ডেপুটি জেলার এবং হেড ওয়ার্ডার সহ বেশ কয়েকজন খাপড়া ওয়ার্ডে প্রবেশ করেন। জেল সুপার মিঃ বিল সরাসরি কমিউনিস্ট নেতা আবদুল হকের  (যশোর) কাছে গিয়ে বলেন ,  ” Be ready Haque, some of you are to be segregated now.” হক সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বলেন,  ” Just sit down please,  we have talks with you about this matter. ” উদ্দেশ্য ছিল কথা বলার মধ্যে দিয়ে তাকে কিছু সময় ব্যস্ত রাখা। আবদুল হকের কথা শেষ হওয়ার আগেই বিল দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ দিয়েই বিল সবেগে দ্রুত বের হতে গেলেন। দরজার কাছে দাঁড়ানো ছিলেন পাবনার বাবর আলী এবং কুষ্টিয়ার দিলওয়ার হোসেন। তাঁদের ওপর দায়িত্ব ছিল দরজা আটকে দেওয়ার। কিন্তু দরজা বন্ধ করার আগেই বিল বেরিয়ে যান। তখনই প্রথমে সতর্কতা সংকেত বেজে ওঠে এবং তার পরপরই বাজতে থাকে পাগলাঘণ্টি। দ্রুত চলে আসে পুলিশ রাইফেল নিয়ে। তাদের পেছনে আসে অবাঙালি কয়েদিরা, হাতে বড় বড় বাঁশের লাঠি। শুরু হলো এলোপাতাড়ি গুলি। খাপড়া ওয়ার্ডের দরজা ছিল একটা কিন্তু জানালা ছিল ২৪ টা। প্রতি জানালার পাশে একজন করে রাইফেলধারী অবস্থান নেয়। এলোপাতাড়ি গুলিতে কিছুক্ষণের মধ্যে খাপড়া ওয়ার্ডের আটক রাজবন্দীদের প্রায় সকলেই কমবেশি গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমেই নিহত হন দিলওয়ার হোসেন। তারপর মৃত্যুবরণ করেন আনোয়ার হোসেন। তিনি সে সময় ছাত্র ফেডারেশনের তুখোড় নেতা। খুলনার বি এল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি ছাত্র ধর্মঘটে খুলনায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তারপর খুলনা থেকে রাজশাহী জেলে প্রেরণা করা হয়েছিল। এভাবে সেদিন শহিদ হয়েছিলেন কুষ্টিয়ার হানিফ শেখ, রংপুরের সুধীন ধর, রাজশাহীর বিজন সেন, ময়মনসিংহের সুখেন ভট্টাচার্য,  দিনাজপুরের তেভাগা আন্দোলনের প্রবীণ প্রখ্যাত কৃষকনেতা কম্পরাম সিংহ। আহত হয়েছিলেন প্রায় সকলেই। তাঁদের মধ্যে বর্ধমানের নুরুন্নবী চৌধুরী, সৈয়দ মনসুর হাবিবউল্লাহ, বগুড়ার শ্যামাপদ সেন, দিনাজপুরের ভূজেন পালিত,  বরিশালের আবদুশ শহিদ, সদানন্দ ঘোষ দস্তিদার, রাজশাহীর  সীতাংশু মৈত্র,  কুষ্টিয়ার সত্যেন সরকার,  ঢাকার নাসিরউদ্দিন আহমেদ, পাবনার আমিনুল ইসলাম বাদশা, বাবর আলী, সিলেটের প্রিয়ব্রত দাস, যশোরের আবদুল হক প্রমুখ।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম জেলখানায় এরকম ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। পাকিস্তান হলে এদেশের মানুষের মুক্তি আসবে বলে যারা বিশ্বাস করেছিলেন তাদের অনেকের বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছিল সেদিন। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ধারালো নখদন্ত সেদিন বেরিয়ে পড়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে পাকিস্তানের মোহ কাটতে শুরু করেছিল। তবে যে মহান লক্ষ্যে অর্থাৎ মানুষের মুক্তির জন্য সেদিন সংগ্রামরত রাজবন্দীরা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, সে মুক্তি আজও আসেনি। আজও খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড আমাদের চেতনায় আঘাত হানে। শহিদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। মানুষের মুক্তির  লড়াই জারি থাকুক। আলো আসবেই। খাপড়া ওয়ার্ডের সকল বীর শহিদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক : অধ্যাপক, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা 

সর্বশেষ

×

আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ