প্রচ্ছদসম্পাদকীয়মুক্তমতনেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল ও বামপন্থীদের করণীয়

নেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল ও বামপন্থীদের করণীয়

জেনারেশন জেডের আন্দোলনে নেপালের সমাজ যখন প্রবলভাবে আলোড়িত, সেই প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে চার বছর বয়সী রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি (আরএসপি)—র‍্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে—দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে বামপন্থী দলগুলো ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়েছে। সাবেক শাসক দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল) প্রতিনিধি সভার ১৬৫টি আসনের মধ্যে মাত্র ৯টি আসন পেয়েছে। একাধিক বামপন্থী দলের সমন্বয়ে গঠিত নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি পেয়েছে ৭টি আসন। জেন জেড আন্দোলনের আগে যারা ক্ষমতায় ছিল, সেই প্রধান দলগুলো মোট আসনের ১০ শতাংশও নিশ্চিত করতে পারেনি।

এই পরাজয়ের রয়েছে গভীর আদর্শিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য। বামপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নেপালের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আদর্শগত বিচ্যুতি, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার অবক্ষয়ের প্রশ্ন তোলে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের পর নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। হিমালয় থেকে তরাইয়ের সমতলভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত সাতটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত স্থলবেষ্টিত দেশ নেপালের জন্য এই মুহূর্তে কূটনৈতিক দক্ষতা অপরিহার্য।

এই নিবন্ধে নেপালের বামপন্থী আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ২০২৬ সালের মার্চের নির্বাচনের বার্তা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বামপন্থীদের করণীয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নেপালের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস-

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দৃষ্টিতে নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি পরিবর্তন উৎপাদনের উপায় এবং সামাজিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। ১৯৫১ সালের অ্যান্টি-রানা আন্দোলন, ১৯৭৯ ও ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন, ১৯৯৬ সালের গণযুদ্ধ এবং ২০০৬ সালের দ্বিতীয় গণআন্দোলন নেপালকে সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছে। তবে সমাজতন্ত্রের পথে যাত্রা অপূর্ণই রয়ে গেছে। প্রজাতান্ত্রিক সংবিধানে উল্লেখিত ‘সমাজতন্ত্রমুখী রাষ্ট্র’-এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিভ্রান্ত করেছে।

নেপালের কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও ২০১৭ সালের নির্বাচনে তারা ঐতিহাসিক জয় পায়। সিপিএন-ইউএমএল এবং মাওবাদী কেন্দ্রের জোট ২৭৫টির মধ্যে ১৭৪টি আসন পেয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পরবর্তীতে এই দুই দল একীভূত হয়ে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি) গঠন করে এবং একটি শক্তিশালী কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেট থাকা সত্ত্বেও দলটি লেনিনবাদী সাংগঠনিক নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। নেতৃত্বের অহংকার, একনায়কতান্ত্রিক আচরণ এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে সরকার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ে। ২০২২ সালের নির্বাচনে এই দুই দল বড় ধাক্কা খায়। কেন্দ্র-ডানপন্থী নেপালি কংগ্রেস ৮৯টি আসন নিয়ে বৃহত্তম দলে পরিণত হয়, আর ইউএমএল ও মাওবাদী কেন্দ্র যথাক্রমে ৭৮ ও ৩২টি আসনে নেমে আসে। ইউএমএল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গঠিত ইউনিফায়েড সোশ্যালিস্ট পার্টি মাত্র ১০টি আসন পেয়ে জাতীয় দলের মর্যাদা অর্জনে ব্যর্থ হয়।

আদর্শিক বিভ্রান্তি পরাজয়ের কারণ-

কম্প্রাডর পুঁজিবাদ, রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে অস্পষ্ট সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নেপালি সমাজ একটি রূপান্তর পর্যায়ে অবস্থান করছে। বামপন্থী নেতৃত্ব লেনিনের এই মৌলিক ধারণা—‘বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী আন্দোলন সম্ভব নয়’—অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংসদীয় রাজনীতিকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নাকি সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এই মৌলিক প্রশ্নে বামপন্থীরা স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি। উৎপাদনের উপায় নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং আত্মনির্ভর অর্থনীতি গঠনের মতো মৌলিক প্রশ্নে তাদের অবস্থান অস্পষ্ট ছিল। ফলস্বরূপ ২০২৬ সালের মার্চের নির্বাচনে তারা চরম পরাজয়ের মুখোমুখি হয়। এই নির্বাচনের ফলাফল নেপালি ভোটারদের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষোভের প্রতিফলন। প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে ধারণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন শক্তি বিপুল সমর্থন অর্জন করেছে।

জেন জেডের প্রভাব-

এই নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা ছিল নির্ধারক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল তথ্যের মাধ্যম নয়, বরং রাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ধারণ ও জনমত গঠনের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বামপন্থী প্রবীণ নেতৃত্ব কর্মসংস্থান, ডিজিটাল অবকাঠামো, শিক্ষা সংস্কার ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো তরুণদের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে শহুরে ও তরুণ ভোটাররা আরএসপির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ভূরাজনীতি নিরপেক্ষতার প্রশ্ন-

নেপাল ভৌগোলিকভাবে ভারত ও চীনের মাঝে অবস্থিত, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।নেপালকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রেখে কৃষি, পানি সম্পদ ও যোগাযোগ খাতে সহযোগিতা নিতে হবে, তবে সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করা যাবে না। বিতর্কিত প্রকল্পগুলো পরিচালনায় স্বচ্ছতা অপরিহার্য।

ফেডারেল কাঠামো স্থানীয় সরকার-

ফেডারেল ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন নেপালের সুষম উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু কেন্দ্রীয়করণ, সম্পদ বণ্টনের অস্পষ্টতা এবং সক্ষমতার অভাব এ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৃষির আধুনিকীকরণ, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার এবং সমবায়ভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে।

প্রযুক্তির গণতান্ত্রিক ব্যবহার-

ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নীতিনির্ধারণে জনমত সংগ্রহ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যের অধিকার, ডেটার জনস্বত্ব এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

করণীয়-

নেপাল আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের গণরায়কে সম্মান জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারে মনোযোগ দিতে হবে।

বামপন্থীদের জন্য প্রধান করণীয়—
১. অর্থনৈতিক কর্মসূচি: কম্প্রাডর পুঁজিবাদের চক্র ভেঙে উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
২. কূটনৈতিক অবস্থান: ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি বজায় রাখা।
৩. তরুণ নেতৃত্ব: যুবশক্তিকে নেতৃত্বে আনা এবং প্রজন্মান্তরের সুশৃঙ্খল রূপান্তর নিশ্চিত করা।
৪. আদর্শিক স্বচ্ছতা: সংসদীয় রাজনীতিকে লক্ষ্য নয়, বরং সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।

মার্কসবাদকে অনুকরণ নয়, বরং নেপালের বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে হবে—‘নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ’-এর ভিত্তিতে।

সমাজতন্ত্রের পথে নেপালের যাত্রা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। সুস্পষ্ট চিন্তা ও শক্তিশালী সংগঠনের মাধ্যমেই সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

লেখক- বলরাম প্রসাদ বাসকোটা

বলরাম প্রসাদ বাসকোটা নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা

[ লেখকের মতামত নতুন কথার সম্পাদকীয়র অবস্থানকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে। – সম্পাদক, নতুন কথা]

সর্বশেষ