বাংলাদেশে দারিদ্র্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি: বৈষম্যও উর্ধমুখী: নির্বাচনী রাজনৈতিক আবহাওয়ায় মানুষের কষ্ট প্রচারে নেই : জনবিস্ফোরণ সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে স্থায়ী রুপ দেবে!
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি অর্থনীতিকে অনেকটা খেয়ে ফেলেছে, অথচ, পুঁথিগত বিদ্যা বলে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নই রাজনীতির মূল লক্ষ্য। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে রাজনীতি অর্থনীতিকে অবহেলা করছে। কারও কর্মসূচিতেই মানুষের অর্থনৈতিক দূর্দশার কথা নেই। অথচ, বিশ্বব্যাঙ্ক এবং আইএমএফ, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারাও সতর্ক করে বলছে, সামনে প্রবৃদ্ধির হার চারের ঘরে থাকবে, দারিদ্র্যের হার ২২%, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ শুন্যের কোটায়, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নিয়োগ নেই, শিক্ষিত বেকারের হার ক্রমবর্ধমান এবং মূল্যস্ফীতি এখনো বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ এর কোটায় ঘোরাঘুরি করছে। মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য দিন দিন কমছে। কয়েক দিন ধরে যেসকল রিপোর্ট পত্রিকায় আসছে তার চিত্র আরও ভয়াবহ।
আজকের প্রথম আলো পত্রিকায় রিপোর্টের শিরোনাম : দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়ছে, মধ্যবিত্ত ঝুঁকিতে।তারা দেখাচ্ছে ২০১৮ তে বিবিএস অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭%, ২০২৪-২৫ এ বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেবে ২১.২% এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির হিসেবে ২০২৫ এ এই হার ২৭.৯%। তারা এর কারণ হিসেবে বলছে, সেই মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, কৃষি খাতে নিম্ন মজুরির কাজ এবং বিনিয়োগে শ্লথ গতির কথা বলেছে। কিন্তু তারা গত একবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কলকারখানা বন্ধ ও নৈরাজ্যের কথা উল্লেখ করেনি।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর একটা তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত হয়েছিল, গত পঞ্চাশ বছরে সেখান থেকে বের হয়ে দারিদ্র্যের হারকে বিশের নিচে নামিয়ে এনেছিল। তখন প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ডালভাতের রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসতো। একদল আরেক দলকে দূর্ভিক্ষের অভিযোগ আনতো। কিন্তু নব্বই দশকের পর থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতি ব্যক্তিখাতে ব্যাপক কাজের সুযোগ তৈরি করে। এতে সরকারি খাতের কর্মসংস্থান কমে আসলেও পরিষেবা ইত্যাদি খাতে বা ইনফরমাল খাতে কাজের সুযোগ বাড়ে এবং মজুরিও বাড়ে। কিন্তু রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ ও কোভিড ১৯ বিশ্বের প্রায় সকল অর্থনীতির মাজা ভেঙে দেয়। এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্র্য নিয়ে যে সকল এনজিও ব্যবসা ছিল তাও কমে আসছিল। বিশ্বব্যাঙ্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা ঠিক করেছিলেন দরিদ্র মানুষকে বিপ্লব থেকে দূরে সরিয়ে আনতে হলে তাদের হাতে নগদ টাকা দিতে হবে। তারপর থেকে বাংলাদেশের মতো দেশে এনজিও প্লাবন বয়ে যায়। কিন্তু গত দুই দশকে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির কারণে দাতারা নগদ টাকা বন্ধ করে দেয়। তারা তখন অধিকারের দিকে চলে যায়, তাদের ফোকাস অর্থনীতি থেকে রাজনীতিতে চলে যায়। তাই এখন দেখা যায়, ক্ষুদ্র ঋণ থেকে মাঝারি ঋণের দিকে এনজিওগুলো চলে যায়। এখন প্রথাগত ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে এনজিওগুলো এসএমই কার্যক্রম চালাচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাঙ্ক এখন গ্রামীণ ও নগরের সাধারণ বাজারে টাকা সরবরাহ করছে। এটা পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থাকে প্রণোদনা দিলেও দূর্ভাগ্যবশত উৎপাদনমুখী বা শিল্প পুঁজিবাদের প্রসার কমে আসায় ক্ষুব্ধ ঋণ বা এসএমই র টাকা মানুষের খাদ্য কিনতে চলে যাচ্ছে। যেকারণে এই ঋণের দুষ্টচক্র থেকে বাঁচতে গ্রামে পরিবারসহ মানুষ আত্মহত্যা করছে।
অন্য দিকে এই দারিদ্র আরও অসহনীয় হয়ে পড়েছে সামাজিক নিরাপত্তা জালের ভাতাগুলো কমে যাওয়ায় যেমন, প্রবীণ ভাতা, বিধবা ভাতা সবই সংকুচিত হয়ে এসেছে। এটাও রাজনীতির কারণে ঘটেছে।
ফলে মধ্যবিত্তকেও এখন সঞ্চয় ভেঙে খেতে হচ্ছে। তারপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হলো ব্যাঙ্কগুলোর তারল্য সংকট। ব্যাঙ্কেও টাকা নেই। আমানতকারীদের পাওনা দিতে পারছে না, বেশ কিছু ব্যাঙ্ক।
তবে এই সময় দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে একটা রাজনৈতিক সরকারের অভাবের কারণে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনীতিতে অধিক মনোযোগী, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তত নয়।
সংবাদে আরও আসছে, সমাজে এখন চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। অতীতের রাজনৈতিক ফরমুলায় বৈষম্য অর্থনৈতিক বিপ্লব আনে কিন্তু বাংলাদেশে এসেছে রাজনৈতিক পরিবর্তন। ফলে রাজনীতির এজেন্ডায় অর্থনীতি গৌণ হয়ে গেছে। একটা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়া দারিদ্র্য কমে না, সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ে।
বাংলাদেশের এই অসহনীয় অবস্থা দরিদ্রের সামনে অর্থনেতিক সমৃদ্ধির জন্যও কোনো বিপ্লব অপেক্ষা করছে না কারণ রাজনীতি এখন রাজনীতির মধ্যেই নিমজ্জিত।
রাজনীতি যেমন দারিদ্র্য আনে তেমনি রাজনীতি ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচনও হয় না, বিপ্লবও হয় না। তাই আপাতত সামনের দিনগুলোতে গরীব ও মধ্যবিত্তের আর্থিক মানসিক চাপ বা যন্ত্রণা ছাড়া আর কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। তাদের জন্য কোথাও কোনো রাজনৈতিক দল নেই।
লেখক– শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক



