ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন : বিএনপির ভূমিধ্বস বিজয় : জামাত জোটের জয় : বিজয়ীরা সব দখল করে নেয় : ভোটারের উপস্থিতির হার ও না ভোটের শতকরা হারে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ছায়া :
চুম্বক পর্যালোচনা:
বিএনপির বিজয় মধ্যপন্থী রাজনীতির বিজয় : মুক্তিযুদ্ধ, সংখ্যালঘু, নারী এবং আদিবাসীদের সমর্থন প্রভাবকের কাজ করেছে: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত সহানুভূতি এবং তারেক জিয়ার স্বদেশে আসা নির্বাচনে ম্যাজিক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে: সরকার পরিচালনায় অতীত অভিজ্ঞতা বিএনপিকে জনমনে এগিয়ে রেখেছিল
জামাতের জয়ের পেছনে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা, সেনাবাহিনীর সহযোগিতা এবং ডাকসুসহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদে বিজয় এবং তরুণ ভোটারদের পছন্দ জামাতের জন্য ইতিবাচক নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করেছিল যার পূর্ণ ব্যবহার জামাত করেছে। এনসিপিসহ কয়েকটি তরুণ ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে জোট জামাতের জন্য ইতিবাচক ছিল। জামাত জোট প্রায় আশির কাছাকাছি আসন পাওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ বা উপাদান কাজ করেছে। প্রথমত, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিষিদ্ধ হওয়ায় তার শুন্যতা জামাতকে প্রবল বিরোধিতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এতে জামাত নিজেদেরকে রাজনৈতিকভাবে সব জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তাদের অতি আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপের মধ্যে কিছু ফাটল তৈরি হয়। বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধকে সব দিক দিয়ে আক্রমণ, নতুন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, সংবিধানের মূলনীতির পরিবর্তন, তীব্র ভারতবিরোধীতা এবং নারী, মাজার ও সংখ্যালঘুদের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী প্রথম দিকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও পরবর্তীতে তা ব্যাকফায়ার করে।
জামাত নির্বাচনে একটা ইতিবাচক ফলাফলের আশায় বিএনপিকে চাঁদাবাজ হিসেবে, দূর্নীতিবাজ হিসেবে আক্রমণ করতে গিয়ে যে ন্যারেটিভ তৈরি করতে চেয়েছিল তাও পরবর্তীতে ব্যাকফায়ার করে। জামাত একদিকে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং ভারতকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে আবার সংখ্যালঘু ভোট টানতে গিয়ে নিজেদের মূলনীতির পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে যা নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। নারী বিষয়ে জামাতের মতামতও সমাজে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। এই বিতর্ক ভোটে কোথাও কোথাও প্রভাব ফেললেও তা মধ্যপন্থীদের সমর্থন পায়নি। বিএনপির শেষ মূহুর্তের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জামাতকে প্রবলভাবে আক্রমণ করে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু ভোটারের মনোযোগ আকর্ষণ করে। বিএনপির বিরুদ্ধে গত দেড় বছরে হামলা মামলার যে সব অভিযোগ ছিল তা তারা মুক্তিযুদ্ধের পয়েন্ট এনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সহানুভূতি টানতে সক্ষম হয়। জামাতের বিরুদ্ধে তারেক রহমানসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা অর্কেস্ট্রার মতো বক্তব্য দেয়। শেষ পর্যন্ত তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গে মাঠে জামাত একা হয়ে যায়।
বিএনপির সফলতা ছিল, জামাতের ইসলামী ভোটকে এক বাক্সে ফেলার উদ্যোগকে ভেঙে দেওয়া। হেফাজতে ইসলামের এক অংশ এবং ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলন আলাদা ভাবে জামাতকে ইসলামের পয়েন্ট থেকে আক্রমণ করে অনেকটা বেকায়দায় ফেলে দেয় এবং তার সুফল বিএনপি নিজের ঘরে তুলে নেয়। কিন্তু উত্তর বঙ্গের ফোটের ফলাফল একটু ভিন্ন কথা বলে। যেমন, ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় জামাত ভালো করে। পশ্চিম বঙ্গ থেকে আগত সীমান্তবর্তী জনগণ জামাতকে সমর্থন করতো। এবার রংপুর নীলফামারীও কুড়িগ্রাম যারা জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক ছিল তারা জামাতকে একচেটিয়া ভোট দেয়। এখানে বিএনপি খারাপ করেছে। বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, কুষ্টিয়া হয়ে জামাতের বিজয় রথেরও একটা ব্যাখ্যা দরকার। এগুলো একসময় আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের প্রভাবাধীন ছিল। আরও একটা বিষয় ব্যাখ্যার দাবি রাখে তাহলো, জামাতের জান্নাতের টিকেট কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, ফেনি, নোয়াখালী ও সিলেটের মতো ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধনী এলাকায় ভালোমতো কাজ কেনো করেনি আবার অন্যদিকে উত্তর বঙ্গের দরিদ্র এলাকার মানুষের কাছে কেনো ভালো বিক্রি হলো ?নির্বাচনের প্যাটার্ন নিয়ে কথা বললে গুরুত্বপূর্ণ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং আরও কয়েকটি এলাকায় না ভোটের আধিক্য। না ভোটের হার প্রকাশ করে সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারের প্রতি ভোটারদের অনাস্থা রয়েছে। এই অনাস্থা ইন্টেরিয়াম সরকারের প্রতিও।এবার ভোটের নতুন সংযোজন হলো পোস্টাল ব্যালেট। এই পোস্টাল ব্যালেট চট্টগ্রামে দুটি সহ মোট চারটি এলাকায় ভোটের জয় পরাজয় নির্ধারণ করে দেয়।
এবার নারীরা প্রবল সম্ভাবনা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলের কাছে তেমন গুরুত্ব পায়নি। আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুরা একটা আত্মরক্ষার দ্বৈরথে পড়ে গিয়েছিল। ভোটের রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়েছে। যদিও বিজয়ীরা সব দখল করে নেয় তবুও না ভোটের এবং ভোটের হারের ছায়া আগামীতেও থেকে যাবে। নির্বাচন ইনক্লুসিভ হয়েছে কীনা তার তত্ত্ব তালাশ চলবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘুরে ফিরে আসবে এবং হাঁ ভোটের বিতর্ক শাসনতান্ত্রিক বিতর্ক থেকে রাজনৈতিক সংকটের দিকে যাবে না – তার গ্যারান্টি নেই।
লেখক- শরিফ শমশির
লেখক ও গবেষক



