ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ: লেনিনের শেষ দিনগুলো : ১৯২২ থেকে ১৯২৪ এর ২১শে জানুয়ারি : ১৯১৮ সালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে স্ট্রোক : তাঁর শেষ কর্মব্যস্থতা: ট্রটস্কি ও স্টালিন প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য : নাদেজদা ক্রুপস্কায়া বলেন- লেনিনের বিরাট কোনো স্মৃতিস্তম্ভ দরকার নেই, দরকার লেনিনের প্রতিটি রচনা অধ্যয়ন: লেনিন এখনো মুক্তিকামী মানুষ ও জাতির চিন্তা ও স্মৃতিতে বেঁচে আছেন!
১৯৮৮ সালে সোভিয়েত লিটারেচার এ এলিজাবেথা ড্রাবকীনার ‘মেডিটেশন ইন গোর্কী’ নামে একটি স্মৃতিকথা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়। তিনি লেনিনের অসুস্থতার সময় সর্বক্ষণের সেবিকা ছিলেন। তাঁর এই স্মৃতিকথা সম্ভবত অনেকদিন প্রকাশিত হয়নি ; পরে স্টালিন বিষয়ে লেখা প্রকাশে শীতলতা আসলে লেখাটি প্রকাশিত এবং অনুবাদিত হয়। অন্য অনেক সূত্র থাকলেও আমার চোখে এই লেখাটি প্রথম লেনিনের শেষ দিনগুলোর চিত্র সামনে নিয়ে আসে। এই লেখাটার সারমর্ম আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কারণ তিনি সবকিছু কাছ থেকে দেখেছেন এবং সূত্র উল্লেখ করে তাঁর মতামত লিপিবদ্ধ করেছেন।
লেনিন সম্পর্কে বিস্তারিত লেখার কিছু নেই। তিনি রুশ বিপ্লবের নেতা। বিপ্লবটি হয় ১৯১৭ সালের নভেম্বরে। এটাকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলে। এটা মার্কস- এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট চিন্তার আলোকে একটা শ্রমিক শ্রেণির শাসন প্রতিষ্ঠার বিপ্লব। রাশিয়ার মানুষ জারের শাসন থেকে যেমন মুক্ত হয় তেমনি পুঁজিবাদের শোষণ ও নিপীড়ন থেকে শ্রমিক কৃষক ও জনসাধারণ মুক্তি পায়। লেনিন ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। সৈনিকরা, শ্রমিক ও কৃষকরা তাঁর প্রতি মুগ্ধ। কিন্তু রাজনীতি বড় জটিল। রাজনৈতিক চিন্তা আরও কঠিন। এখানে মতপার্থক্যের কারণে হত্যা পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। লেনিনও তার ব্যতিক্রম নন। ১৯১৮ সালের আগস্টে সোশালিস্ট রেভুলোশনারি দলের একজন সদস্য ফ্যানী কাপলান মস্কোর অদূরে একটা অস্ত্র কারখানার সামনে জনসভা শেষে ফেরার সময় লেনিনকে এফডাবলিউএম১৯০০ পিস্তল থেকে পরপর তিনটা গুলি করে। একটা গুলি কোটে, একটা কাঁধে এবং একটা তাঁর ফুসফুসে গিয়ে আঘাত করে। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও একটা গুলি দেহে থেকে যাওয়ায় তাঁর আয়ু কমে আসে। ১৯২২ সালের প্রথম দিকে তিনি প্রথম স্ট্রোক করেন। তিনি কয়েক মাস চিকিৎসায় থাকতে বাধ্য হন। বাধ্য হন লিখতে একারণে যে, তিনি যতক্ষণ হুঁশে থাকতেন ততক্ষণ ডাক্তারের পরামর্শ উপেক্ষা করে বিভিন্ন লেখালেখি বা ডিকটেশন দিতেন। লেনিন খুব উদ্বিগ্ন থাকতেন বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। এই সময় লেনিনের অনুপস্থিতি জনগণ বা বহির্বিশ্ব অনুধাবন করতে পারেনি কারণ তাঁর নোট, প্রবন্ধ এমনকি নানা বিষয়ে বিতর্ক ক্রমাগত প্রকাশিত হচ্ছিল।
এই সময় গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ছিল নয়া অর্থনৈতিক পলিসি বা ন্যাপের নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। এটা ছিল সমাজতন্ত্রের মধ্যপন্থী নীতিমালা। কারণ ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরপর পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাথে যুদ্ধের কারণে যুদ্ধ-অর্থনীতির নীতিমালা বাস্তবায়ন চলছিল। এরপরই লেনিন নিয়ে আসলেন, ন্যাপ নীতিমালা। কিন্তু এই নিয়ে পার্টিতে বুখারিন প্রমূখের সাথে বিতর্ক চলছিল। বাজার এবং মুদ্রা থাকবে কীনা। বৈদেশিক বাণিজ্য কেমন হবে। অসুস্থ অবস্থায় লেনিন লিখে পাঠাচ্ছেন নোটের পর নোট এবং প্রবন্ধ। তিনি লিখেছেন, পুঁজিবাদী দেশের সাথে বাণিজ্য চলবে, আমদানি রপ্তানি চলবে। এগুলো বড় বড় সিদ্ধান্ত শুধু ছিল না, ছিল বড় বড় তাত্ত্বিক মতামত। অন্যরাও কম যেতেন না, সবাই স্কলার ছিলেন। এই বিতর্কগুলো অনেক সময় দলাদলিতে পরিণত হতো। মীমাংসা বা সিদ্ধান্ত লেনিনের কাছ থেকে আসতো।অসুস্থতা একটু সেরে উঠলেই তিনি ব্যস্থ হয়ে পড়েন তৃতীয় আন্তর্জাতিককে সক্রিয় করার জন্য। তিনি পৃথিবীর সব দেশের ডেলিগেটদের সাথে দেখা করতেন এবং কথা বলতেন। সকলের মতামত বা লেখা পড়তেন।
এইসময় তিনি থিসিস দেন, নিপীড়িত দেশের জনগণের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিককে কাজ করতে হবে। তিনি স্লোগান তুললেন, নিপীড়িত জাতির মুক্তি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিতে হবে। চীন ভারত ও মধ্য এশিয়ার মুক্তি। তিনি এইভাবে বললেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যারা যুক্ত হবে সেসব দেশের আবার স্বাধীন হওয়ারও অধিকার থাকবে। জাতিসংঘের চেয়েও গনতান্ত্রিক জাতীসমূহের সোভিয়েত বা ফেডারেশন। যাইহোক, ১৯২৩ সালে আরেকটা স্ট্রোকে তাঁর হাতগুলো অবশ হয়ে যায়। চিকিৎসা চলছে। ডাক্তার বললেন, পূর্ণ বিশ্রাম। কোন লেখালেখি চলবে না। কোনো দর্শনার্থীও দেখা করতে পারবে না। স্টালিন এই সময় কঠোর ভাবে লেনিনের সাথে লোকজনের দেখা করা বন্ধ করে দিলেন। লেনিনের স্ত্রী ক্রুপস্কায়াসহ পরিবার অসন্তোষ্ট ছিলেন। তারপরও লেনিন অদম্য। ডাক্তারকে বললেন, তিনি পড়ালেখা ছাড়তে পারবেন না। পড়ার অনুমতি দিতে হবে। এছাড়া, ডিকটেশন দেওয়ার অনুমতি দিতে হবে। তিনি একজন প্রাইভেট সেক্রেটারিরও দাবি করলেন। তিনি পড়াশোনা করতে না পারলে ক্রুপস্কায়া তাঁকে পড়ে শোনাতেন। এইসময় পড়ছেন মার্কীন সাহিত্য। পড়ছেন আয়রন হীল। যাইহোক, নতুন সমস্যা ঘনিয়ে এলো। বিপ্লবের অন্যতম নায়ক ট্রটস্কি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের বৈপ্লবিক ক্ষমতা দাবি করে বসলেন। এই নিয়ে পার্টিও স্টালিনের সাথে লেগে গেলো। আবার জাতিগত এবং পিপলস কমিশনার হিসেবে স্টালিন বেশ উদ্ধত ও রুঢ আচরণ শুরু করলেন। লেনিন কেন্দ্রীয় কমিটি ও রাজনৈতিক ব্যুরোকে লিখলেন, ট্রটস্কি জিনিয়াস, বিপ্লবে বিপুল অবদান রয়েছে কিন্তু তাঁর দাবি হঠকারী। অন্যদিকে, স্টালিনের জাতীয় প্রশ্নে সঠিক হলেও এত রুঢতা চলবে না। পার্টি ভেঙে যাবে। তিনি বিস্তারিত নোট লিখে পাঠালেন। ক্রুপস্কায়া গোপনে খামবন্ধ করে কংগ্রেসে দিলেন। স্টালিন এই মন্তব্য দ্রুত গ্রহণ করে বললেন, কমরেড লেনিন সঠিক। আমি ওয়াদা করছি আজ থেকে আর রূঢ ব্যবহার করবো না। স্টালিনের বক্তব্য সরলভাবে সবাই গ্রহণ করে তাঁকে সেক্রেটারির পদ থেকে আর অপসারণ করলেন না। লেনিনের প্রস্তাব ছিল স্টালিনকে সেক্রেটারির পদ থেকে অপসারণ করে ভদ্র বিনয়ী ও সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য একজনকে সেক্রেটারি করা। একজন মনোনিতও ছিলেন কিন্তু তা হলো না। ফলাফল লেনিনের মৃত্যুর পর স্টালিনের হাতে সব ক্ষমতা চলে আসে এবং পার্টির বিভক্তি অনিবার্য হয়ে পড়ে।
যাইহোক, ভাঙন দেখার আগে লেনিন ১৯২৪ সালের ২১শে জানুয়ারি মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে নাদেজদা ক্রুপস্কায়া বলেন, ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের কফিনের কাছে থেকে আমার মনে হয়েছে আমি কিছু কথা বলি।কমরেডগণ, আমাদের প্রিয় ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন মারা গেছেন। আমার অনুরোধ হলো তাঁর জন্য কোনো মনুমেন্ট তৈরি করবেন না।তাঁর নামে কোনো প্রাসাদ বা মিউজিয়াম তৈরি করবেন না, তাঁকে স্মরণের নামে বড় বড় সমাবেশ করবেন না। তিনি জীবদ্দশায় এগুলো পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁর দেশের জন্য কাজ করতে ভালোবাসতেন। আমাদের সব ক্ষেত্রে তার চিন্তাকে অনুসরণ করা উচিত। লেনিন জীবনের প্রতি ক্ষণে বিপুল লিখে গেছেন। এইসব লেখায় তাঁর চিন্তা লিপিবদ্ধ আছে। আপনারা বরং তাঁর লেখা পড়বেন, বারংবার পড়বেন। তাঁর লেখা গভীরভাবে পাঠ করলে আপনারা অতীত সম্পর্কে জানবেন এবং বর্তমান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। লেনিন যেনো কখনো গতকাল বা অতীত না হন, তিনি সবসময় আজ এবং আগামীকাল। তিনি সবসময় সময়ের আগে এবং মানবজাতির আগে এবং কমিউনিজমের সংগ্রামে একজন ভ্যানগার্ড।
লেনিন মৃত্যুর ১০২ বছর পরেও ভ্যানগার্ড।
লেখক- শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক



