“নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী: কানাডার পথ”
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF), ডাভোস, সুইজারল্যান্ড — ২০ জানুয়ারি ২০২৬
১. ভূমিকা ও মূল বক্তব্য-
ধন্যবাদ, ল্যারি। এই বৈশ্বিক ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আপনাদের সঙ্গে উপস্থিত হতে পারা আমার জন্য একদিকে আনন্দের, অন্যদিকে দায়িত্বের। আজ আমি বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন, একটি “সুন্দর গল্পের” অবসান এবং এমন এক কঠোর বাস্তবতার কথা বলব, যেখানে মহাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগীতা কার্যত কোনো কার্যকর সীমাবদ্ধতার অধীন নয়।তবে একই সঙ্গে আমি এই বক্তব্যও রাখতে চাই যে, কানাডার মতো মধ্যম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলো অসহায় নয়। মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার মতো মূল্যবোধকে ধারণ করে তারা একটি নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে।
২. আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙন-
প্রতিদিনই আমরা অনুভব করছি যে আমরা এক গভীর মহাশক্তি-প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে প্রবেশ করেছি। তথাকথিত “নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা” ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। থুসিডিডিসের সেই প্রাচীন উক্তি— “শক্তিমান যা পারে তাই করে, দুর্বলকে যা সহ্য করতে হয় তাই সহ্য করে”— আবার যেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনিবার্য নিয়ম হিসেবে হাজির হচ্ছে এই বাস্তবতার মুখে অনেক দেশই মনে করে, ঝামেলা এড়িয়ে শক্তিধরদের সঙ্গে মানিয়ে চললেই নিরাপত্তা মিলবে। কিন্তু আমি স্পষ্টভাবে বলছি— এটি কাজ করবে না দশকের পর দশক ধরে কানাডার মতো দেশগুলো এই নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার অধীনে সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা এর প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুক্ত ছিলাম,নীতিমালার প্রশংসা করেছি এবং এর পূর্বানুমেয়তার সুফল ভোগ করেছি। এই ব্যবস্থার ছায়াতলেই আমরা মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পেরেছি।
আমরা জানতাম এই ব্যবস্থার গল্প আংশিক সত্য, আংশিক কল্পনা। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো প্রয়োজনে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাত, বাণিজ্য আইন অসমভাবে প্রয়োগ হতো, এবং আন্তর্জাতিক আইন অনেক সময় অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগীর পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে কার্যকর হতো। তবুও এই কল্পনাটি কার্যকর ছিল, কারণ মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাটি নৌপথের নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সমষ্টিগত নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক সুবিধা সরবরাহ করত কিন্তু এই সমঝোতা এখন আর কার্যকর নয়। আমরা কোনো রূপান্তরের মধ্যে নেই; আমরা একটি ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আর্থিক সংকট, মহামারি, জ্বালানি সংকট ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে অতিমাত্রায় বৈশ্বিক সংযুক্তির ঝুঁকি। আজ অর্থনৈতিক সংযুক্তিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে— শুল্ক চাপ প্রয়োগের মাধ্যম, আর্থিক অবকাঠামো রাজনৈতিক হাতিয়ার, আর সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বলতার জায়গা হয়ে উঠেছে।
৩. এই ভাঙনের তাৎপর্য-
যখন সংযুক্তি পারস্পরিক লাভের বদলে অধীনতার উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তখন “উভয়ের মঙ্গল”-এর গল্পে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জাতিসংঘ বা জলবায়ু সম্মেলনের মতো বহু বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান আজ দুর্বল। ফলে অনেক দেশ একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে— খাদ্য, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ,অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় কৌশলগত স্বনির্ভরতা অপরিহার্য যে দেশ নিজেকে খাওয়াতে পারে না,জ্বালানি জোগাতে পারে না, কিংবা আত্মরক্ষা করতে পারে না— তার বিকল্প পথ সীমিত। কিন্তু সবাই যদি নিজেদের দুর্গে আবদ্ধ হয়, তবে বিশ্ব আরও দরিদ্র, আরও অনিরাপদ ও আরও ভঙ্গুর হবে।
৪. কানাডার কৌশলগত প্রতিক্রিয়া-
প্রশ্ন হলো— মধ্যম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলো কীভাবে অভিযোজিত হবে। কানাডা এই বাস্তবতা প্রথম দিকেই উপলব্ধি করেছে এবং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে।আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদ”— আমরা একসঙ্গে নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী হতে চাই। নীতিনিষ্ঠ, কারণ আমরা সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে অটল। বাস্তববাদী,কারণ আমরা জানি যে অগ্রগতি ধাপে ধাপে আসে এবং বিশ্বের বাস্তবতা প্রায়ই আমাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মেলে না। আমরা পৃথিবীকে যেমন আছে তেমন করেই মোকাবিলা করি।
৫. অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতি-
দেশের ভেতরে আমরা কর হ্রাস করেছি, প্রাদেশিক বাণিজ্য বাধা সরিয়েছি, এবং জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করেছি।আন্তর্জাতিকভাবে আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করেছি, এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথে সম্পর্ক বিস্তৃত করছি এবং ইস্যুভিত্তিক জোট গড়ে তুলছি — ইউক্রেন, আর্কটিক নিরাপত্তা।
অনুবাদ- প্রফেসর ড. সুশান্ত দাস



