শনিবার,১০,জানুয়ারি,২০২৬
13 C
Dhaka
শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬
প্রচ্ছদসীমানা পেরিয়েঅ্যাডাম স্মিথ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প : মুক্তবাজার অর্থনীতি দেশের দরিদ্র এমনকি...

অ্যাডাম স্মিথ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প : মুক্তবাজার অর্থনীতি দেশের দরিদ্র এমনকি মধ্যবিত্তকেও পোড়াচ্ছে

বলা হয় আমরা এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে বসবাস করছি। আমাদের সব কিছু যেমন উৎপাদন,  বিরতণ, ভোগ থেকে সঞ্চয়,  কৃষি থেকে শিল্প,  শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন মায় পরিষেবা ও আনন্দ – সবই মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়মে চলবে। পুঁজি ও শ্রমও মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়মে চলবে।  আর এই মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা হলেন অ্যাডাম স্মিথ। অষ্টাদশ শতকের এই অর্থনীতিবিদকে আলঙ্কারিক ভাবে অর্থনীতির জনকও বলা হয়।  তাঁর দুটি প্রভাবশালী মত: একটি জাতীসমূহের সম্পদ অন্যটি হলো শ্রম তত্ত্ব। সব কথার নির্যাস হলো, জাতীসমূহ সম্পদ উপার্জন করবে উৎপাদন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে।  আর এই উৎপাদন ও বিনিময় ঘটবে একটা শাসকদের নিয়ন্ত্রণহীন মুক্তবাজার অর্থনীতিতে। যেখানে উৎপাদন বা যোগানের এবং চাহিদার বিষয়টা এমন একটা পয়েন্টে মিলবে যেখানে উৎপাদক ও ভোক্তা স্বাধীন।  তাহলে বাজারের স্থিতিস্থাপকতা কে মেলাবে? তিনি বললেন,  একটা অদৃশ্য হাত। যাক, তিনি বললেন,  সম্পদের আরেকটি উৎস সোনাদানা নয়, তাহলো শ্রম।  শ্রমের মূল্য তত্ত্বে এখানে এসে তিনি থেমে গেলেন।

মুক্তবাজার অর্থনীতির ক্ষেত্রে আরেকটি  হলো, পণ্য বিনিময়ে কোনো দেশের  শুল্ক বাধা হবে না। অর্থাৎ, আড়াইশ বছর আগে স্মিথ সাহেব বললেন,  প্রত্যকে উৎপাদন ও বিনিময়ে স্বাধীনতা ভোগ করবে। এর মধ্যে অদৃশ্য হাতের কাজ হবে ন্যায় বিধান করা। কিন্তু স্মিথের এই আশাবাদ সত্ত্বেও অদৃশ্য হাত এখন কোম্পানিগুলোর দখলে,  তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং পণ্যের যোগান ও চাহিদা তৈরি করে। বাংলাদেশে এরাই হলো সিন্ডিকেট,  আছে কিন্তু ধরা যায় না।  আর শুল্ক উৎপাদন ও বিনিময়ের বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাধা হবে না – স্মিথের এই সরল মন্তব্যের কঠোর বিরোধী হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  তিনি শুল্ক যুদ্ধের সূচনা করে এডাম স্মিথকে যেমন চ্যালেন্জ করলেন তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপদে ফেলেছেন। বাংলাদেশও তার আগুনে পুড়ছে। অর্থনীতিতে তথাকথিত সিন্ডিকেট যেমন ক্রিয়াশীল তেমনি মুদ্রাস্ফীতিও উর্ধমুখী।

ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধে প্রায় ৬০ টির মতো দেশ আক্রান্ত। ট্রাম্পের এই শুল্কহার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। আমদানি শুল্ক বা রফতানি শুল্ক শেষ বিচারে জনগণকেই বহন করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জনগনকেও আমদানি শুল্কের বোঝা বইতে হবে।  দ্রব্যের দাম বাড়বে।  এই ধরনের উচ্চ শুল্কহার তিরিশের দশকে একবার যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল তেমনি মহামন্দাকেও ঠেকাতে পারেনি।বর্তমানেও ইউরোপ ও অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি শুল্কহার বৃদ্ধি না করলেও নীতিগত ভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নেবে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন সে পথে হাঁটছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিও চাপে পড়বে।  মুক্তবাজার অর্থনীতির একজন একনিষ্ঠ সমর্থক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বলেছিলেন,  শুল্ক সুরক্ষা দেয় না,  উল্টো ফল দেয়।  কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে – ট্রাম্পের কর্মফল দেখার জন্য। এরইমধ্যে,  বলা যায়,  অর্থনীতিবিদ স্টীগলিজের ভাষায়,  শুল্ক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করে। এর আগে নিক্সনের সময়ও এরকম ঘটেছে। অন্যদিকে,  ট্রাম্প এখন যেভাবে চলছে তাতে করে সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাকরি সংকুচিত হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব পড়বে অর্নীতিতে। মূল কথা হলো, মুক্তবাজার অর্থনীতির লজিক অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ জাতীসমূহকে ধনী করবে না।  এডাম স্মিথের এই বাণী ট্রাম্প উল্টে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষ করে ট্রাম্পের শুল্ক চুক্তির কারণে চাপে পড়েছে।  গার্মেন্টস খাতে এর প্রভাব পড়বে দীর্ঘ মেয়াদে।  অন্য দিকে,  চুক্তির কারণে, বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের বাজার যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিণত হলে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক নিঃস্ব হয়ে যাবে।  পণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।  এখন প্রতিদিন যেসব খবর বের হয় তাতে অর্থনীতির সুখবর তেমন নেই।  আইএমএফ যতই নরম কথা বলুক না কেনো, ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সব শর্ত পূরণ করে নিচ্ছে।  অর্থ উপদেষ্টা বলছেন,  আইএমএফের শর্ত পূরণ বেশ কঠিন।  আইএমএফও বলছে, বাংলাদেশকে একটা সীমার অতিরিক্ত ঋণ প্রদান করা যাবে না।  কয়েক শত কলকারখানা হয়তো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নয়তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে,  কয়েক লক্ষ শ্রমিক বেকার,  শিক্ষিত বেকারের হার উর্ধগামী, সিন্ডিকেট,  প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং দারিদ্র্যের হার ২৮% এ পৌঁছা- কোনোটাই সুলক্ষণ নয়। বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে কেনো? পণ্যের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে – তা আর সীমাবদ্ধ নেই।  আছে স্মিথের অদৃশ্য হাত আর ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধে।  মুক্তবাজারের দুই বিপরীত নীতির যাঁতাকলে বাংলাদেশ পড়েছে এবং পুড়ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দরিদ্র এমনকি মধ্যবিত্তকেও এখন  পোড়াচ্ছে। আর তার প্রতিকারে কবে যে আমরা স্মিথ ও ট্রাম্পের হাত থেকে মুক্তি পাব! জানি না।  ততদিন নরকের মতো মূল্যস্ফীতির আগুনে আমাদের পুড়তে হবে – : নিয়তি। শ্রীলঙ্কা অতিক্রম করলো- আমরা পারছি না – রাজনীতির মাঠে এর ফয়সালাও তেমন দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষক- শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক

সর্বশেষ