প্রচ্ছদসম্পাদকীয়মুক্তমতআগামী নির্বাচনে তুরুপের তাস কি ধর্ম নাকি ১৯৭১:  ...

আগামী নির্বাচনে তুরুপের তাস কি ধর্ম নাকি ১৯৭১:  নির্বাচন ও গণভোট কাদের ক্ষমতায় আনবে! /?

“রাজনীতির কথকতা : আগামী নির্বাচনে তুরুপের তাস কি ধর্ম নাকি  ১৯৭১: বিএনপি ও জামায়তের মাঠের বিতর্ক কতটুকু নির্বাচনী মাঠ তৈরি করবে: নির্বাচন ও গণভোট কাদের ক্ষমতায় আনবে! /?”

বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে নির্বাচনের হাওয়া মাঠে বইছে। মাঝখানে একটা সংশয় তৈরি হয়েছিল,  নির্বাচন আদৌও হবে কীনা। এখন পত্রিকা পাঠ করলে নির্বাচন হচ্ছে – এরকম একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পত্রিকা লিখেছে বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় সাময়িক বিরতি থাকলেও বিএনপি পুরোপুরি নির্বাচনের মানসিকতায় ফিরে এসেছে। আর এই নির্বাচনী হাওয়ায় বিএনপি এবং জামায়াতের নির্বাচনী বাক-যুদ্ধ বেশ জমে উঠেছে। এই যুদ্ধে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং জামায়াতের আমিরও যুক্ত হয়ে পড়েছেন। জামায়াতের আমির বলেছেন,  যাদের অতীত ভালো নয় তাদের ভোট দেওয়া ঠিক হবে না। এর জবাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছেন,  যারা অতীতের কথা বলে তাদের ৭১ এর ভূমিকা সবাই জানে। মানে বিএনপির হাই কমান্ড এই প্রথমবার জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ কে হাজির করলো। এটা আগে বিএনপির অন্য নেতারা বলতেন। তাঁরা জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকার কথা বলতেন। এটা জামায়াতের জন্য তেমন সুখকর নয়।
জামায়াত এতদিন ১৯৭১ সালকে তেমন পাত্তা দেয়নি। গত একবছরে জামায়াত চব্বিশের চেতনা এবং জুলাই সনদের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের একটা বিজয় হিসেবে দেখিয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ড এই বিষয়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ করেনি। কারণ এই রাজনীতি বিএনপির অস্বস্তি তৈরি করে না। এর বড় উদাহরণ হলো বিএনপি তার দলের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বলায় অনেককে শাস্তিও দিয়েছিল। ফলে জামায়াত তার একাত্তরের  দূর্বলতাকে অনেকটা আত্তীকরণ করেছে এবং তাদের নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান তরুণদের আকৃষ্ট করেছে। এর ফলে তারা ডাকসু,  জাকসু, রাকসু ও চাকসু জয় করে তরুণদের এক নম্বর পছন্দের জায়গায় চলে আসে। এইসব সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের হার বিএনপিকে নৈতিকভাবে কিছু নিচু করে। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা তাদের পূর্ণ শক্তিকে কাজে লাগাতে শুরু করে।  বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতদিন জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে তা বেহেশতের টিকেট হয়ে যাবে জাতীয় বক্তব্যের মোকাবিলা করছিল। গ্রামের নিরক্ষর নারী ও প্রবীণদের কাছে জামায়াতের অনেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে একটা পবিত্র প্রতীক হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করে আসছেন। এই বিষয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় নানা সংবাদ প্রকাশিত হয়ে আসছিল। এই বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব ব্যাখ্যা দাবি করলে জামায়াত তা অস্বীকার করে। তারপর দূর্নীতি,  মামলা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয় বিএনপির বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে। এটার তেমন কোনো যুৎসই জবাব বিএনপি দিতে পারেনি। বিএনপি তখন জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যাংক বীমা দখলের অভিযোগ নিয়ে আসে। ইসলামী ব্যাঙ্কের ব্যাপারে জামায়াত অস্বীকার করলেও সত্য হলো এই ব্যাঙ্কের পরিচালনা তারা নিয়েছে। এটার বেশি প্রচার হয়েছে একটা জেলার কয়েক হাজার কর্মী ছাঁটাই হওয়ার পর।
জামায়াত নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনায় একজন হিন্দু ধর্মালম্বীকে মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াত অফিসিয়ালি একটা হিন্দু শাখা খুলেছে। এটার বহুমাত্রিক ফলাফল থাকতে পারে। যেমন সংখ্যালঘু কার্ডের কিছু তাস নিজেদের হাতে রাখা। বিএনপি এই ক্ষেত্রে তেমন সুবিধায় নেই।  তাঁদের দলে কয়েক জন হিন্দু বৌদ্ধ নেতা থাকলেও সংখ্যালঘুদের ভোট ব্যাঙ্ক তাদের পক্ষে কতটুকু সাড়া দিবে তা নিয়ে সংশয় আছে। এছাড়া রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের ভোট। এটা একটা জটিল হিসাব। জামায়াত একটা ধর্মনিরপেক্ষ স্পেস তৈরি করে সংখ্যালঘু ভোট টানার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা কিছুটা কাজ দিবে। কিন্তু এই ব্যাঙ্কের সব ভোট বিএনপি না পেলে তাকে তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে। বিএনপির একজন নেতা নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের ভোটারদের ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়া কি হয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।  জামায়াত যদিও বলছে,  তারা ধর্ম নিয়ে কাজ করে কিন্তু ব্যবহার করে না, বিএনপি তার বিপরীতে বলছে,  না জামায়াত ধর্মের কার্ড খেলছে। তাই তারাও জামায়াতে বক্তব্যকে মাঠে ময়দানে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এখানে বিএনপি তেমন সুবিধা করতে পারছে বলে মনে হয় না।
তাই বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ এর কার্ড খেলা শুরু করেছে। বিএনপি জানে ১৯৭১ সাল জামায়াতের একটা গোপন দূর্বলতা। এই দূর্বল জায়গায় আঘাত করলে জামায়াতের বেশ অস্বস্তি হবে। শেষ বিচারে দেখা যাচ্ছে আগামী নির্বাচনে ধর্ম এবং ১৯৭১ উভয়ই এক এক দলের তুরুপের তাস হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ধর্মের কার্ড এবং ১৯৭১ সালের ভূমিকা উভয়ই ব্যবহৃত হবে – দেখার অপেক্ষায় কে জিতে নাকি অন্য কোনো এজেন্ডা জিতে?  কারণ নির্বাচনে ধর্মের কার্ড গনতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কার জয় কার পরাজয় তা দেখার জন্য। কারণ এতোদিন বিএনপি জামায়াত একটা ব্রাকেটেই বন্দী ছিল।
লেখক- শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক

সর্বশেষ