নির্বাসনের দেয়াল ভেঙে ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন এবং মায়ের মৃত্যুর ধকল কাটিয়ে এবার চার দিনের সফরে উত্তরাঞ্চলে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ১১ থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ধারাবাহিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি।
সফরকালে তারেক রহমান নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নির্বাচনি আচরণবিধি পুরোপুরি অনুসরণ করবেন এবং কোনোভাবেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করবেন না বলেও জানানো হয় বিএনপির দপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে।
যেখানে বলা হয়, সফরের প্রথম দিন ১১ জানুয়ারি ঢাকায় কর্মসূচি শেষে গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তারেক রহমান। পরে তিনি বগুড়ায় পৌঁছাবেন। ১২ জানুয়ারি বগুড়া থেকে সফর শুরু করে তিনি রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার যাওয়ার কথা রয়েছে তার। রংপুর সফরে তারেক রহমান জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাঈদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া করার কর্মসূচিও রয়েছে। ১৩ জানুয়ারি পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক ও মতবিনিময় করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
প্রথম দফার সফরের শেষ দিন ১৪ জানুয়ারি রংপুর ও বগুড়ায় আরও কয়েকটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। সফরকালে তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শহীদ আবু সাঈদ এবং তৈয়বা মজুমদারসহ নিহত জুলাই যোদ্ধা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহতদের কবর জিয়ারত করবেন। এ ছাড়া, তাদের পরিবারের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
সুত্র জানায়, তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে বগুড়া শহরজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। পৌরসভার উদ্যোগে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলো নতুন করে সাজানো হচ্ছে। সংস্কার করা হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এর মধ্যে উল্লেখযাগ্য গোহাইল সড়ক সাতমাথা থেকে ফুলতলা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে খানাখন্দে ভরা এই সড়কটি মাত্র ১০ দিন আগেও যানবাহন চলাচলের জন্য ছিল অত্যন্ত দুর্ভোগের। তারেক রহমানের সফরের প্রাক্কালে সড়কটি খানাখন্দ ভরাট করে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
এ ছাড়াও তারেক রহমানের জন্য জেলা বিএনপির কার্যালয়ে নির্ধারিত কক্ষটিও নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এরইমধ্যে কক্ষটির ফ্লোরে টাইলস বসানো, সিলিং ডেকোরেশন ও রঙের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া বগুড়া পৌরসভার উদ্যোগে শহরের শাকপালা এলাকায় তারেক রহমানের নামে করা পার্কটি সংস্কার করা হচ্ছে। শহরের রিয়াজ কাজী লেনে অবস্থিত ‘গ্রিন এস্টেট’ নামের বাড়িটিও সংস্কার করা হয়েছে। এই বাড়িটি তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিবিজড়িত। একসময় এখান থেকেই তিনি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন।
তারেক রহমানের দ্বিতীয় সফর সূচিও জানা গেছে এরইমধ্যে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করতে আগামী ১৮ জানুয়ারি কক্সবাজার যাবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গাড়িতে কক্সবাজারের কোথায় কোথায় যাবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। কী কী কর্মসূচি নেওয়া যায় তা নিয়ে চলছে আলোচনা। এরপরই দলীয়ভাবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কক্সবাজার সফরসূচি চূড়ান্ত করা হবে। তবে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর সভা-সমাবেশের বাধা-নিষেধ থাকায় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সেই কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না এবার। তবু আয়োজিত এলাকায় কমতি নেই দলের প্রধানের বরণ।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। নির্বাচন সামনে রেখে দলটি এবার বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে তাদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নে। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের অঙ্গীকার তুলে ধরা হবে এই ইশতেহারে। আর সেই ইশতেহার নিয়ে মাঠে নামবে এ দল। তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ দলের এই নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছেন বিভিন্ন সেক্টরের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের আগে চেনা-জানা পথ দীর্ঘ দিনে বিচরণ না থাকায় সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। নিজ নির্বাচনি এলাকা বগুড়ায় যাবেন প্রায় দুই দশক পর।
বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমানের নির্দেশনায় এবার বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে আটটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়াও ক্ষমতায় গেলে ১০০ দিনের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও থাকবে। ইশতেহারে জনগণের কাছে নতুন চমক দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দিতে চায় বিএনপি। সার্বিক বিবেচনায় একটি কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে চমক দেখানোর মতো কর্মসূচি বা জনসেবার কথা থাকবে ইশতেহারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তার পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত নানা কর্মসূচির পরিকল্পনার কথাও থাকবে এতে। জানা গেছে, ‘৩১ দফার আলোকে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করা হবে। যেখানে জনগণের জন্য নানা ধরনের উন্নয়নের চমক থাকবে। বিশেষ করে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রারিদ্র্য নিরসন, নারী শিক্ষার উন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি গুরুত্ব পাবে।
তারেক রহমান এখন গণতন্ত্রের ‘টর্চ বিয়ারার’ বা পথপ্রদর্শক। গণতন্ত্রের যে মশাল শহিদ জিয়ার হাতে শুরু হয়েছিল, তা দীর্ঘ সময় বহন করেছেন খালেদা জিয়া। এখন সেই মশাল তারেক রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন গণতন্ত্রের টর্চ বিয়ারার হচ্ছেন তারেক রহমান। অনেক চমক থাকছে। বাংলাদেশের মানুষকে আর আগের মতো ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সে পথেই হাঁটছে।’
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে পরিবর্তনের সুযোগ। এ পরিবর্তন হতে পারে দায়িত্বশীল রাজনীতি, জনগণের অধিকার এবং একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের পথে যাত্রা। সময় এসেছে নীতিনির্ভর রাজনীতির। সময় এসেছে জনগণের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তনের। ইশতেহারে থাকা প্রতিটি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সত্যিকার পরিবর্তন আনবে বলে প্রতাশ্যা।



