আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারকে ‘বাস্তবতা বিবর্জিত ও অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী’ বলে মন্তব্য করেছে ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)। সংস্থাটির মতে, জামায়াত ও বিএনপির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার। এসব সংস্কার ছাড়া প্রতিশ্রুতিগুলো রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত ‘কোন দলের কেমন ইশতেহার?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিভিন্ন দলের ইশতেহারে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও অর্থনৈতিক দর্শন ও বাস্তবায়নের পথে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিএনপি বাজারভিত্তিক অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভবিষ্যতমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি, যুব কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল শিল্পকে গুরুত্ব দিয়েছে। সিপিবি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সমাজতান্ত্রিক পুনর্বণ্টনের কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকে ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর জামায়াত উচ্চ প্রবৃদ্ধির আধুনিক কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির কথা তুলে ধরেছে।
সুজনের মতে, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আয়-বৈষম্য ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলেও ইশতেহারগুলোতে এসব সমস্যার টেকসই সমাধানের রূপরেখা স্পষ্ট নয়।পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিএনপি সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির কথা বলেছে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন মুসলিম বিশ্বকেন্দ্রিক সংহতির ওপর জোর দিয়েছে। এনসিপি বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অবস্থান নিয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ইশতেহারগুলোতে জিও-পলিটিক্স ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান যথাযথভাবে উঠে আসেনি বলে মন্তব্য করেছে সুজন। সংস্থাটি বলেছে, সব দলের ইশতেহারের বড় দুর্বলতা হলো আর্থিক প্রাক্কলনের ঘাটতি। কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কত অর্থ প্রয়োজন এবং সেই অর্থের উৎস কী—তার স্পষ্ট হিসাব নেই। ফলে প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জামায়াতের ইশতেহার বাস্তবায়নে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, করের আওতা সম্প্রসারণ, সরকারি নিয়োগ ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমানো অপরিহার্য। এসব সংস্কার ছাড়া কর কমিয়ে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়। বিএনপির ইশতেহারের কয়েকটি বড় প্রতিশ্রুতি—এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা, চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ—কে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অস্পষ্ট বলে উল্লেখ করেছে সুজন। কৃষক কার্ডের ভর্তুকির পরিমাণও স্পষ্ট নয় বলে জানানো হয়। পাশাপাশি ধনীদের করের আওতায় আনতে গেলে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি ও নীতিগত দিকনির্দেশ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কোন দলের দর্শন বাস্তবে রূপ পাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।



