বৈশিষ্ট্যগতভাবে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও সমস্যা নেই। দেশটার সঙ্গে কিংবা তাদের প্রাক্তন অলিগার্কতন্ত্রের সঙ্গেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নেই। সমস্যাটা রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এবং তাদের কর্পোরেট শ্রেণির সঙ্গে। সমস্যাটা রয়েছে সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যা শুরু করেছিল প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের প্রথম সরকার। ২০০১ সালে শাভেজের বলিভারিয় প্রক্রিয়া একটা আইন পাস করেছিল যার নাম দেওয়া হয় অর্গানিক হাইড্রোকার্বন আইন। সেই আইনে দেশের সব গ্যাস ও তেল সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। গ্যাস ও তেলের অন্বেষণ ও নিষ্কাশনের আপস্ট্রিম কাজকর্মের (তেলের ভাণ্ডার অনুসন্ধান ও নিষ্কাশন) দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলির হাতে। তবে ডাউনস্ট্রিম কাজকর্মে (যেমন তেল পরিশোধন ও বিক্রি) অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বেসরকারি সংস্থাকে, এমনকী বিদেশি কোম্পানিগুলিকেও। ভেনেজুয়েলায় রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পেট্রোলিয়ামের ভাণ্ডার। সেই তেল সম্পদ ভেনেজুয়েলা অনেক আগেই ১৯৪৩ সালের আইনের মাধ্যমে জাতীয়করণ করেছিল। এবং পরে ১৯৭৫ সালে ফের জাতীয়করণ করা হয়। তবে ১৯৯০ সালে নয়া উদারবাদী সংস্কারের যে-কর্মসূচি চাপিয়ে দিয়েছিল আইএমএফ ও বৃহৎ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি, তখন তেল শিল্পের অনেকটা অংশেরই বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল।
যখন শাভেজ নতুন আইন কার্যকর করলেন, তখন রাষ্ট্রের হাতে তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ ফিরে এল (দেশের বাইরে থেকে আসা রাজস্বের ৮০ শতাংশের উৎস ছিল বিদেশে তেল বিক্রি)। এর ফলে মার্কিন মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলি ক্রুদ্ধ হল। বিশেষ করে এক্সন মোবাইল এবং শেভ্রন কোম্পানি প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সরকারের ওপর চাপ দিল শাভেজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে। ২০০২ সালে শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। এই অভ্যুত্থান স্থায়ী হয়েছিল কয়েক দিন। তারপর ভেনেজুয়েলার তেল কোম্পানির দুর্নীতিগ্রস্ত ম্যানেজমেন্ট ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে ধ্বস নামাতে ধর্মঘট লাগিয়ে দিল (পরে শ্রমিকেরাই ওই কোম্পানিকে রক্ষা করেছিল এবং ম্যানেজমেন্টের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল)। অভ্যুত্থানের চেষ্টা এবং ধর্মঘট — দুটো অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে থেকে জয়ী হয়ে বেরিয়ে এলেন শাভেজ। কারণ দেশের মানুষের মধ্যে তাঁর সমর্থন ছিল বিপুল। ২০২৫ সালে যাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সেই মারিয়া কোরিনা মাচাদো একটা গোষ্ঠী তৈরি করলেন এবং নাম দিলেন সুমাতে (‘যোগ দিন’)। তারা ব্যালটে ফের গণভোটের দাবি জানাল। ২০০৪ সালে নথিভুক্ত ভোটারদের ৭০ শতাংশ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (৫৯ শতাংশ) শাভেজকেই দেশের প্রেসিডেন্ট পদে রাখার জন্য ভোট দিলেন। কিন্তু মাচাদো কিংবা তার মার্কিন মদতদাতারা (মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি সহ) সহজে ক্ষান্ত দিল না। সেই ২০০১ থেকে এখনও পর্যন্ত তারা বলিভারিয়ান প্রক্রিয়াকে উৎখাত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এবং কার্যত মার্কিন মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলিকে ক্ষমতায় ফেরানোর চেষ্টা করছে। সুতরাং, ভেনেজুয়েলার প্রশ্নটি মোটেই ততটা ‘গণতন্ত্রের’ প্রশ্ন নয়, (গণতন্ত্র কথাটা বহু ব্যবহারে জীর্ণ, আসলে শব্দটা থেকে এর ব্যঞ্জনাকেই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে)। আসলে ভেনেজুয়েলার বিষয়টা হল আন্তর্জাতিক শ্রেণি সংগ্রাম। এর অন্তর্বস্তু হল তাদের দেশের গ্যাস ও তেল সম্পদ স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার ভেনেজুয়েলার জনগণের থাকবে নাকি মার্কিন মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলি ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করবে।
বলিভারিয় প্রক্রিয়া-
১৯৯০ সালে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হুগো শাভেজের আত্মপ্রকাশ। তখনই তিনি ভেনেজুয়েলার বেশির ভাগ মানুষের, বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকদের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন। সেই দশকটা ছিল নাটকীয় বিশ্বাসঘাতকতার দশক — দেশের প্রেসিডেন্টদের বিশ্বাসঘাতকতা। এঁরা প্রথমে বলেছিলেন আইএমএফ-এর চাপিয়ে দেওয়া কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির হাত থেকে তেল সমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলাকে তাঁরা রক্ষা করবেন। অথচ পরে আইএমএফ-এর সেই সব পদক্ষেপই তাঁরা কার্যকর করেন। তাদের কেউ ছিলেন সোশাল ডেমোক্র্যাট ( যেমন ডেমোক্রেটিক অ্যাকশনের কার্লোস আন্দ্রে পেরেজ, যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত), কিংবা রক্ষণশীল (যেমন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটসদের রাফায়েল ক্যালডেরা যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত)। ভণ্ডামি ও বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজনৈতিক জগতের সংজ্ঞা। একই সঙ্গে সমাজে তৈরি হয়েছিল চরম অসাম্য (এই সময় জিনি সূচক ছিল ৪৮.০-র মতো উঁচুতে)। শাভেজের পক্ষে জনাদেশ ছিল এই ভণ্ডামি ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদ (শাভেজ নির্বাচনে জিতেছিলেন ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে, আর পুরোনো দলগুলির প্রার্থীরা পেয়েছিলেন ৩৯ শতাংশ ভোট)।
১৯৯৯ সাল থেকে (যে বছর শাভেজ ক্ষমতায় এলেন) ২০১৩ সাল পর্যন্ত (যখন মাত্র ৫৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়) — এই পর্বে তেলের দাম ছিল চড়া যা শাভেজ ও বলিভারিয় প্রক্রিয়ার পক্ষে সহায়ক হয়েছিল। তেলের রাজস্ব শাভেজ এমন সামাজিক অর্জনের লক্ষ্যে কাজে লাগিয়েছিলেন যা ছিল আসলে অভূতপূর্ব। প্রথমে তিনি গণ সামাজিক কর্মসূচির জন্য (মিসিওনেস) সম্পদ তৈরি করলেন। সেই কর্মসূচির মাধ্যমে তেল রাজস্বের অর্থ মানবিক সম্পদ মেটানোর কাজে খরচ করা হল। সেই কাজগুলো হল প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা (মিশিওন বাররিও অ্যাদেনত্রো), শ্রমিক শ্রেণি এবং কৃষকদের জন্য সাক্ষরতা ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা (মিশিওন রবিনসন, মিশিওন রিবাস এবং মিশিওন সুক্রে), খাদ্য সার্বভৌমত্ব (মিশিওন মেরক্যাল এবং তারপর পিডিভিএএল) এবং আবাসন (গ্রান মিশিওন ভিভিয়েনদা)। রাষ্ট্রকে নতুন চেহারা দেওয়া হয়েছিল সামাজিক ন্যায়ের হাতিয়ার হিসাবে কাজে লাগানোর জন্য, বাজারের লাভের অংশ থেকে শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকদের ছেঁটে ফেলার জন্য নয়। যখন এই সংস্কারগুলোর অগ্রগতি ঘটল, সরকার তখন অংশগ্রহণমূলক হাতিয়ারের সাহায্যে গণভিত্তিক ক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ শুরু করল। এগুলি ছিল কমিউন (কমিউনাস)। এই কমিউনগুলি প্রথম আত্মপ্রকাশ করল জনভিত্তিক পরামর্শদাতা পরিষদের মধ্যে দিয়ে (কনসেজোস কমিউনালেস) এবং তারপর সেগুলো হয়ে উঠল জনভিত্তিক সংস্থা যারা সরকারি তহবিল নিয়ন্ত্রণ করত, স্থানীয় স্তরে উন্নয়নের জন্য কাজ করত, কমিউনভিত্তিক ব্যাঙ্ক গড়ে তুলত এবং স্থানীয় স্তরে কো-অপারেটিভ উদ্যোগ গঠন করত (এমপ্রেসাস ডে প্রোডাকশিওন সোশ্যাল)। কমিউনগুলো হল বলিভারিয় প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ স্তরের অবদান অসম কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জনভিত্তিক ক্ষমতা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস যার লক্ষ্য ছিল অলিগার্কদের শাসনের একটা স্থায়ী বিকল্প গড়ে তোলা।
ভেনেজুয়েলার ওপর মিশ্র যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-
২০১৩–১৪ সালের দুটি ঘটনা বলিভারিয় প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করে তুলেছিল: প্রথমত, হুগো শাভেজের অকালমৃত্যু। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন বিপ্লবী শক্তির আসল চালক। এবং দ্বিতীয়ত, তেল থেকে পাওয়া রাজস্ব শুরুতে ধীরগতিতে এবং পরে ধাপে ধাপে কমে আসা। শাভেজের মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট হন প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা নিকোলাস মাদুরো। তিনি জাহাজ ঠিক মতো চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তখন তেলের দাম কমছিল। ২০১৪ সালের জুনে তেলের দাম ছিল প্রায় ব্যারেল পিছু ১০৮ ডলার। সেই দাম ২০১৫ সালে কমে গেল নাটকীয়ভাবে (৫০ ডলারের কম)। আরও কমল ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে (৩০ ডলারের নীচে)। বিদেশ অপরিশোধিত তেল বিক্রির আয়ের ওপর দারুনভাবে নির্ভর করত ভেনেজুয়েলা। ফলে তেলের দাম কমা দেশের পক্ষে হয়ে দাঁড়াল বিপর্যয়কর। তেল নির্ভর পুনর্বণ্টন ব্যবস্থাকে বদলাতে পারেনি বলিভারিয় প্রক্রিয়া (এই ব্যবস্থা চালু ছিল শুধু দেশের মধ্যে নয়, ওই অঞ্চলেও চালু ছিল যার মধ্যে ছিল পেট্রোক্যারিবে ব্যবস্থা)। ফলে বলিভারিয় প্রক্রিয়া আটকে পড়ে রইল তেল রপ্তানির নির্ভরতার ফাঁদে। এতে উপস্বত্বভোগী রাষ্ট্র যে সব দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে তার মধ্যে পড়ে গেল ভেনেজুয়েলা। অন্যদিকে বলিভারিয় প্রক্রিয়া আধিপত্যকারী শ্রেণিগুলির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেনি। অর্থনীতি ও সমাজে এদের ভালরকম প্রভাবই রয়ে গিয়েছিল। এ-সবের কারণে সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পে পুরোদমে উত্তরণ আটকে গেল।
২০১৩ সালের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা এবং লাতিন আমেরিকার অলিগার্ক বাহিনী তাদের অস্ত্র শানিয়ে রেখেছিল ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মিশ্র যুদ্ধ শুরু করার জন্য। ১৯৯৮-এর ডিসেম্বরে শাভেজ প্রথম নির্বাচনে জিতেছিলেন এবং পরের বছর প্রেসিডেন্ট পদে বসার আগে ভেনেজুয়েলা দেখেছিল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পুঁজির পলায়ন। কারণ ভেলেজুয়েলার অলিগার্করা তখন তাদের সম্পদ মায়ামিতে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। অভ্যুত্থানের চেষ্টা ও তেল লকআউটের সময় আরও বেশি পুঁজি চলে যাওয়ার প্রমাণ মিলছিল। এর ফলে ভেনেজুয়েলার মুদ্রার স্থায়িত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তখন ভেনেজুয়েলাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কূটনৈতিক ফাঁদ পাততে শুরু করেছিল। তারা বলল, ভেনেজুয়েলার সরকার আসলে একটা সমস্যা এবং তারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোট গড়তে শুরু করল। এর জেরে ২০০৬ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক ঋণের বাজার থেকে ভেনেজুয়েলার ঋণ পাওয়ার সুযোগের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হল। ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলি, বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের ঋণের দরুন সুদের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিল। এর ফলে কম সুদে নতুন করে ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ল। তারপরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক ভাবে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করল।
শাভেজের মৃত্যুর পর এবং তেলের দাম যখন কমছিল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা পরিকল্পিত মিশ্র যুদ্ধ শুরু করল ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে। হাইব্রিড ওয়ার বা মিশ্র যুদ্ধ মানে অর্থনৈতিক জবরদস্তি, আর্থিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ করা, ভুল তথ্যের প্রচারযুদ্ধ, আইনি মারপ্যাঁচ, কূটনৈতিকভাবে একঘরে করা, বেছে বেছে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানো। এই সব হিংসাত্মক ঘটনার লক্ষ্য সার্বভৌম রাজনৈতিক প্রকল্পগুলিকে বিপথগামী করা ও অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করার নানা উপায় কাজে লাগানো যাতে পুরোদমে আগ্রাসন চালানোর আর দরকার পড়ে না। এই যুদ্ধের লক্ষ্যে ভূখণ্ড দখল নয়। বরং রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের পথ প্রস্তুত করা: যেসব রাষ্ট্র জাতীয় সম্পদ পুনর্বণ্টনের চেষ্টা করছে, জাতীয়করণ করছে কিংবা স্বাধীন বিদেশ নীতি নেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের সবক শেখানোই লক্ষ্য। হাইব্রিড ওয়ার কার্যকর করা হয় প্রতিদিনকার জীবনকে হাতিয়ারে পরিণত করে। মুদ্রার ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়, নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, ঘাটতি বা অভাব তৈরি করা হয়, মিডিয়ায় বিকল্প ভাষ্য তৈরি করা হয়, এনজিওগুলিকে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়, আইনগতভাবে হেনস্থার ব্যবস্থা করা হয় (আইনিযুদ্ধ), তৈরি করা হয় বৈধতার সংকট। এসবের লক্ষ্য রাষ্ট্রের ক্ষমতার ক্ষয় করা, সাধারণ মানুষের সমর্থনে ভাঙন ধরানো এবং সামাজিক সংহতিকে টুকরো টুকরো করে দেওয়া। এর ফলে যে দুর্ভোগ দেখা দেয় তখন তার জন্য দায়ী করা হয় দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে এবং দেশের বাইরে থেকে জোরজবরদস্তির যে স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়েছে তাকে আড়াল করা হয়। সেই ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেআইনিভাবে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তখন থেকে ওপরে উল্লিখিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে ভেনেজুয়েলা। ২০১৮ সালে যখন দ্বিতীয় দফার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় তখন সংকট আরও গভীর হয়েছে, সমস্ত পেমেন্ট সিস্টেম ও বাণিজ্যের রাস্তা তছনছ হয়ে গেছে এবং মার্কিন বিধি আরও বেশি করে মানতে বাধ্য করা হয়েছে। পশ্চিমি মিডিয়ার তৈরি করা ভাষ্যে পরিকল্পিতভাবে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি খাটো করে দেখানো হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেখা হয়েছে, বাড়িয়ে দেখা হয়েছে আর্থিক ঘাটতি বা অভাবকে, অভিবাসনকে দেখানো হয়েছে পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসাবে। এবং এভাবে শাসক বদলের ভাষ্যকে সামনে আনা হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় জীবন ধারনের মানে একেবারে ধ্বস নামে। অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করার জন্য স্তরে স্তরে এত যে আয়োজন, সেই কৌশলকে জীবন ধারনের গুণমানে ধ্বসের কারণ থেকে আলাদা করা যাবে না। ভাড়াটে সৈন্যদের দিয়ে হামলা, বিদ্যুতের গ্রিডে অন্তর্ঘাত, গুয়ানা ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সংঘাত বাধিয়ে দেওয়া যাতে এক্সনমবিলের লাভ হয়, বিকল্প প্রেসিডেন্টের উদ্ভাবন (জুয়ান গুয়াইদো), যিনি নিজের দেশের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করছেন তাকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করা (মাচাদো), প্রেসিডেন্টকে গুপ্ত হত্যার চেষ্টা করা, ভেয়েজুয়েলার উপকূল থেকে দূরে মাছ ধরার নৌকায় বোমা ফেলা, ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যাচ্ছে এমন অয়েল ট্যাঙ্কার জবর দখল করা, দেশের উপকূলের অদূরে নৌবহর সজ্জিত করা,— এমন প্রতিটি কাজেরই লক্ষ্য হল ভেনেজুয়েলার মধ্যে একটা স্নায়বিক উত্তেজনা তৈরি করা যাতে বলিভারিয় প্রক্রিয়া আত্মসমর্পণ করে এবং ১৯৯৮ সাল ফিরে আসে। এবং তারপর দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি দেয় এমন সব ধরনের হাইড্রোকার্বন আইন বাতিল ঘোষণা করা।
যদি দেশটাকে ১৯৯৮ সালে ফিরে যেতে হয়, ঠিক যেমনটা করবেন বলে মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাহলে মিশিওনেস এবং কমিউনাস-এর মাধ্যমে যা কিছু অর্জিত হয়েছে, ১৯৯৯ সালের সংবিধানের মধ্যে দিয়ে যা কিছু অর্জিত হয়েছে, তার সবটাই বাতিল হয়ে যাবে। বস্তুত মাচাদো একথাও বলেছেন যে, যদি ভেনেজুয়েলার লোকেদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বোমা ফেলে সেটা হবে ‘ভালোবাসার মতো কাজ’। যারা এই সরকারকে উৎখাত করতে চায় তাদের স্লোগান হল, অতীতের দিকে পা বাড়াও।এদিকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কারাকাসে একদল শ্রোতার উদ্দেশে মাদুরো ইংরেজিতে বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ, আমার কথা শুনুন, যুদ্ধ নয়, হ্যাঁ, শান্তিই’। সেই রাতেই রেডিও ভাষণে তিনি সতর্ক করে দেন, ‘জমানা বদল নয়, কারণ এসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সব অন্তহীন, ব্যর্থ যুদ্ধের কথা যা ঘটেছে আফগানিস্তানে, ইরাকে, লিবিয়ায় এবং আরও অনেক দেশে। সিআইএ-এর মদতপুষ্ট ক্যুদেতা চাই না।’ ‘যুদ্ধ নয়, হ্যাঁ শান্তিই’- এই লাইনটাকে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং গানের সঙ্গে রিমিক্স করেছে। অনেকগুলো সমাবেশে ও সভায় মাদুরো একাধিক বার হাজির হয়েছেন। সেখানে ধ্বনিত হয়েছে আগুনের মতো উজ্জ্বল সংগীতের সুর, আর মাদুরো কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়েছেন যুদ্ধ নয়, হ্যাঁ শান্তি। এবং অন্তত একটি বার তিনি সেই টুপিও পরেছিলেন যাতে লেখা ছিল এই বার্তা।
লেখক- বিজয় প্রসাদ
ভারতীয় ঐতিহাসিক,সাংবাদিক,ভাষ্যকার এবং মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী



