আফগানিস্তানের নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেছেন, এক ইঞ্চি ভূমিও তাঁরা দিবেন না। তারপরই ঘোষণা আসলো, আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভারত সফর করবেন। চীন হুশিয়ারী উচ্চারণ করলো। রাশিয়া আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি দেবার প্রক্রিয়া শুরু করলো। রাশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর মস্কোয় সন্ত্রাস বিরোধী সম্মেলন ডাকলেন। যোগ দিয়েছে আফগান ভারত ও পাকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ।
মজার বিষয় হলো, এতোদিন সন্ত্রাস বিরোধী সম্মেলন আহবান করতো যুক্তরাষ্ট্র। তাঁরা সন্ত্রাস বলতে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীকে বোঝাত যার প্রধান বা উৎস বা আশ্রয়দাতা হিসেবে আফগানিস্তানকে বোঝানো হতো। আর এবার মস্কোয় সন্ত্রাস বিরোধী সম্মেলনে যোগ দিয়েছে আফগানিস্তান : আর সন্ত্রাস হিসেবে দেখা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ধমকধামককে। বিশ্বের তাবৎ সন্ত্রাসী ঘটনার জনক এককথায় যুক্তরাষ্ট্র। গাজাতে ইসরায়েলের বোমা বর্ষণ, গণহত্যা, দূর্ভিক্ষ এবং লক্ষ লক্ষ লোককে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ও অস্ত্রে। ক্যারিবীয় সাগরে ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়ার নিরস্ত্র জেলেদের উপর মার্কীন রনতরীর থেকে হামলা হচ্ছে, গণহত্যা হচ্ছে। ইরানে কাতারে ইয়েমেনে বিমান হামলা করছে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে। ফলে মস্কোর সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়ে চীন, রাশিয়া, আফগানিস্থান ও ভারত এক প্লাটফরমে যুক্ত হয়েছে। এখানে ইরানও আছে। আছে পাকিস্তানও। পাকিস্তান সেনাপ্রধান একদিকে ট্রাম্পকে শান্তির নোবেলের প্রস্তাব দেয়, সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে ভারতকে কেন্দ্র করে, যুক্তরাষ্ট্রকে আহবান জানিয়েছে আরব সাগরে বন্দর বানাতে ভারতের ভূমি দখলের জন্য, পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি বিমান বন্দর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিয়েছে – আবার মস্কোতেও সন্ত্রাস বিরোধী সম্মেলনেও যোগ দিয়েছে। পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্ক তেমন ভালো নেই, ভারতের সাথে সম্পর্ক দা-কুমড়া । তথাপি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ। যাইহোক, আফগানিস্তানের বাগরাম বিমান বন্দরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান একটা শাঁখের করাতে আছে। আফগানিস্তানের বাগরাম দখলে ট্রাম্প যুদ্ধ ঘোষণা করলে তাঁকে পাকিস্তানের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে হবে ; তখন আফগান -পাকিস্তান যুদ্ধ অনিবার্য। ট্রাম্পের টার্গেট হলো চীন, বাগরাম একারণে তাঁর দরকার। কিন্তু চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ আছে পাকিস্তানে। ট্রাম্প ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করলে চীনের পাকিস্তানের বিনিয়োগ থেমে যাবে। অন্যদিকে ভারতও বাগরাম নিয়ে স্বস্তিতে নেই। ইদানীং শুল্ক যুদ্ধ নিয়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ শীতল। রাশিয়া চীন ও ভারতের একটা নেক্সাস তৈরি হচ্ছে শুল্ক যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে তেলের কারণে ইরান ভারত চীন ও রাশিয়া একসারিতে আছে।
সবাই মিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সমান নয় কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপীয় ন্যাটোকে টেনে এনে বাগরাম বিমান বন্দর যুদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে তার জন্য উন্মুক্ত আছে পাকিস্তান ও সাগর -মহাসাগর। উপসাগরীয় যুদ্ধে ইউএসএস ডেস্ট্রয়ার গুলো মোক্ষম ভূমিকা পালন করেছিল- একথা সকলেই জানেন।
আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর সেই রকম একটা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ ইউএসএস ফিৎজেরাল্ড চট্টগ্রাম বন্দরে শুভেচ্ছা সফরে এসেছে। কাকতালীয়। বাংলাদেশ জানিয়েছে এই যুদ্ধ জাহাজটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করবে। এটা নিয়মিত শুভেচ্ছার একটা বর্ধিত রুপ। কিন্তু আন্তর্জাতিক নৌ সমর বিশেষজ্ঞগণ সবকিছুকে সন্দেহের চোখে দেখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বঙ্গোপসাগরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজের মহড়া দেখা গিয়েছিল । তখন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের বন্ধু ভাবা হয়নি। এখন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বন্ধু।
আফগানিস্তানও একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ছিল যখন মোজাহিদরা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। তারপর তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ বছরের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করে কিন্তু এখনো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানে কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। এখন আফগানদের বন্ধু হলো রাশিয়া, চীন, ভারত ও ইরান। আর যুক্তরাষ্ট্র এখনো বন্ধু নয়। অন্য দিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বন্ধু ছিল না, আজ ৫৪ বছর পর বন্ধু। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব কি তা আফগানিস্তান জানে; হাড়ে হাড়ে জানে।
এখন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের শুভেচ্ছা সফর নাকি বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা বা বন্দর যুক্তরাষ্ট আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।