যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যাটেল ফিল্ড বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্র চীনের মধ্যেকার বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব ঢাকায় উভয় দেশের রাষ্ট্রদূতদের প্রকাশ্য বক্তব্যে প্রকাশিত : বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কোথায়! /?
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চীনের সাথে একটা বৈরী সম্পর্ক শুরু করেন। সিনেটর ন্যান্সীর তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তারপর শুরু হয়েছিল চীনের একটা মোবাইল কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে বাণিজ্য যুদ্ধ । পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তা শুল্ক যুদ্ধে পরিণত হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক চুক্তি এবং বার্মা এ্যাক্ট ইত্যাদির মাধ্যমে চীনকে সরাসরি টার্গেট করা হয়। বিশেষ করে সাউথ চায়না সাগরে চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের যৌথ সামরিক মহড়া বেশ সিরিয়াস।
সেই হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশ তাদের অক্ষশক্তিতে থাকবে। গত সরকারের আমলে তা টানাপোড়েনে পরিণত হয়। এখন প্রকাশিত নানা তথ্যে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রেজিম চেইঞ্জ এ সম্পৃক্ত ছিল। বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয় বর্তমান ইন্টেরিয়াম সরকারের কার্যকলাপে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যাকে কেন্দ্র করে একটা মানবিক করিডোর চায়। এই মানবিক করিডোরের বিরোধিতা করে চীন। চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, চীন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বহুপাক্ষিক নয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর জোর দেয়। সরকারের ইচ্ছা সত্ত্বেও পরিস্থিতি পাল্টে যায়। করিডোর ইস্যু এখন স্থগিত। এরপর ২০২৫ সালে প্রধান উপদেষ্টা চীন সফর করে কয়েকটি সমঝোতা চুক্তি করে। প্রধান উপদেষ্টার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল চীনকে দিয়ে ভারতকে মোকাবিলা করবেন। এটা নিয়ে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ভারতকে নীরব করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একক নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিল, তাতে তারা রেজিম চেইঞ্জ এর কারণে সফলও হয়েছিল কিন্তু বাংলাদেশের চীনপ্রীতি নতুন করে সমস্যা তৈরি করে। বাংলাদেশ পাকিস্তান ও চীনের সাথে সামরিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক সম্প্রসারণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বাংলাদেশ চীনের সাথে কিছু সামরিক চুক্তি করে। এছাড়াও আরও কিছু বিনিয়োগ চুক্তিও করে। এই কর্মকান্ড যুক্তরাষ্ট্রের চোখে তেমন ভালো ঠেকছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ অতিসম্প্রতি শুল্ক যুদ্ধ এড়াতে বেশ কিছু চুক্তি করে। এইসব চুক্তি বাংলাদেশের তেমন পক্ষে না থাকলেও তা একটা বাধ্যতার বিষয় ছিল। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ পাওয়ার পরই বেশ কিছু বক্তব্য রাখেন। তার মর্ম হলো, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখা তাঁর অগ্রাধিকার। প্রথমত বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব খর্ব করা দ্বিতীয়ত চীনের সাথে সম্পর্ক করলে তার পরিণাম সম্পর্কে বাংলাদেশকে সজাগ বা সতর্ক করা। এবার তিনি সরাসরি তা বললেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যের প্রতিবাদ আসলো চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে। এটা পরিষ্কার বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের এখন এক নম্বর প্রতিযোগী হলো চীন। তা আপাতত বাণিজ্য হলেও তা সামরিক সংঘর্ষে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এছাড়াও, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে এবং মায়ানমার সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হলো চীন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তা গোপন না করে সরাসরি প্রকাশ্যে বলেছেন। কিন্তু এতদিন চীনের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি। আজ তা প্রকাশ্যে আসলো। চীনের রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে অপ্রাসঙ্গিক বলেছেন। কিন্তু প্রসঙ্গতো চলেই আসলো। ঢাকা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যাটেল ফিল্ড বা বাকযুদ্ধ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আসল যুদ্ধ কতদূর? তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কোথায়! /?
লেখক- শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক


