১। ভূমিকা: সাম্রাজ্যবাদী দাবার ছক ও প্রান্তিক দেশ-
যুদ্ধ কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতারই স্বাভাবিক পরিণতি। এটি বিশ্ব পুনর্বণ্টন, কৌশলগত সম্পদের (বিশেষ করে জ্বালানি) ওপর নিয়ন্ত্রণ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তিকে দমন করার সংগ্রাম। পশ্চিম এশিয়ায় (যাকে আমরা সাধারণত মধ্যপ্রাচ্য বলি) পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়; বৈশ্বিক শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনঃনির্ধারণের জন্য যে কাঠামো তৈরি করছে, তারই এক বিস্ফোরক অধ্যায়। বাংলাদেশের মতো বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রান্তে অবস্থিত একটি দেশের জন্য এই যুদ্ধ লাভের কিছু নয়—শুধু সংকটের শৃঙ্খল।
বাংলাদেশ—যে দেশ পাকিস্তানি সামরিক উপনিবেশবাদ ও মার্কিন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিল, যে দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক পুঁজিবাদী বাস্তবতায় এতটাই সংযুক্ত যে পশ্চিম এশিয়ার ভূমিকম্প তার ভিত কাঁপিয়ে দেবে। প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি, জ্বালানি আমদানি, তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক বাজার—এই সব খাতের সুতো বেঁধেছে বাংলাদেশকে ঐ অঞ্চলের যুদ্ধের সম্ভাবনার সঙ্গে। এই যুদ্ধ শুধু বাংলাদেশকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ করবে না; বরং এ দেশের নয়া উদারতাবাদী অর্থনৈতিক মডেলের ভঙ্গুরতা উন্মোচন করবে এবং অভ্যন্তরীণ শ্রেণি-সংঘাত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে চরমে নিয়ে যেতে পারে।
২। অর্থনৈতিক অস্থিরতা: রেমিট্যান্সনির্ভর কল্যাণ-রাষ্ট্রের (!) পতন-
এটা সবাই স্বীকার করে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম মূল চাবিকাঠি হলো প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ পশ্চিম এশিয়ায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। একবার যদি সেখানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বেঁধে যায়—বিশেষ করে ইরান এবং পারিপার্শ্বিক দেশগুলো পরিপূর্ণভাবে তাতে জড়িয়ে পড়ে এবং হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়—তাহলে বাংলাদেশের ওপর পড়বে দ্বিবিধ আঘাত: একদিকে হঠাৎ করে শ্রমিকরা ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন, অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। সার্বিকভাবে দেখলে নীচের বিষয়গুলি সামনে চলে আসে।
(১) শ্রমিক প্রত্যাবর্তনের সংকট-
‘শ্রম রপ্তানি’ প্রান্তিক পুঁজিবাদের ( তা যদি ক্রোনি পুঁজিবাদ হয়, তাহলে আরও ) একটি কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। —রাষ্ট্র দেশের ভেতরে শ্রমশক্তির উৎপাদন খরচ বহন করে, আর সেই শ্রম বিক্রি করে সাম্রাজ্যবাদের মিত্র দেশগুলোতে (উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোতে)। যুদ্ধ শুরু হলে এই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো—যারা নিজেরা সামন্ত-পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠী—প্রথমে নিজেদের নাগরিক ও সম্পদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যেমন লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক ফিরে এসেছিলেন, তেমনই আগামী যুদ্ধ—যা সম্ভবত আরও বিধ্বংসী হতে পারে—লাখ লাখ শ্রমিককে দেশে ফিরিয়ে আনবে। শুধু রেমিট্যান্স কমবে তাই নয় (বর্তমানে যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৮০ শতাংশের সমান), দেশের ভেতরে তৈরি হবে বিশাল বেকারত্ব। শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় রাষ্ট্র তখন শ্রমশক্তির উদ্বৃত্ত সংকটের সম্মুখীন হবে—যা রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিভাষায় শ্রেণি-অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ।
(২) জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য:
বাংলাদেশ জ্বালানি তেল ও গ্যাসের জন্য আমদানি–নির্ভর, এবং এসব জ্বালানির বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে। সার্বিক যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বাড়বে, জাহাজ ভাড়াও চড়বে। ফলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় আকাশছোঁয়া হবে, টাকার মান কমবে এবং নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি অসহনীয় আকার ধারণ করবে। এটা নয়া-উদারিকরণের যগে বাজার-নির্ভরতার এক বৈশ্বিক চিত্র । ক্ষমতাসীন সকল সরকারই বিকল্প ব্যবস্থানির্ভর, গণমালিকানাভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে অস্থির বৈশ্বিক বাজারের ওপর ভরসা রেখেছে, ‘ফাস্ট ট্র্যাক’– এ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়েছে যেগুলো দামি আমদানি করা জ্বালানি পোড়ায়। এই বাড়তি খরচের ভার পড়বে শ্রমজীবী ও কৃষক ও অল্প আয়ের সাধারণ মানুষের ওপর—পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, তার ফলে, খাদ্যের দাম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠবে।
(৩) তৈরি পোশাক খাত ও সরবরাহ শৃঙ্খল:
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের ক্রোনী পুঁজিবাদের প্রধান স্তম্ভ—যার বাজার পশ্চিমা দেশগুলোতে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলো ব্যাহত হবে, যার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, যদি এই যুদ্ধ পশ্চিমা গণমাধ্যমে ‘সভ্যতার সংঘাত’ হিসেবে চিত্রিত হয়, তাহলে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে মন্দা দেখা দিতে পারে। পোশাকের চাহিদা কমে গেলে কারখানা বন্ধ হবে, মজুরি বকেয়া পড়বে, আর চাকরি হারাবেন নারী শ্রমিকেরা—যাঁরা এই সময়কালে বাংলাদেশের সবচেয়ে সংগঠিত শ্রেণি হিসেবে আজ অবধি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
৩। রাজনৈতিক অস্থিরতা: চরমপন্থা ও রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের উত্থানের বিপদ:
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর যে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা বোঝার জন্য মতাদর্শগত ময়দানকে চিনতে হবে। পশ্চিম এশিয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি হজ ও উমরাহর স্থান, একইসঙ্গে ধর্মীয় পুঁজির আধার। ফলে, এই অঞ্চলে অস্থিরতার ফলে নিমোক্ত বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
(১) দেশের ভেতরে মেরুকরণ:
যুদ্ধ যদি সাম্প্রদায়িক চিন্তা ধরে ফ্রেম করা হয় (যেমন ইরান–সৌদি অথবা ইরান–ইসরায়েল সংঘাত), তাহলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ভেতরকার সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বিভাজনকে উসকে দেবে। বাংলাদেশের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হলেও দেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র ঐতিহাসিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ (১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা) ও কিন্তু সাম্প্রতিককালে তা ক্রমশ শক্তিশালী ডানপন্থি ইসলামপন্থী রাজনীতির মধ্যে দোদুল্যমান। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ দেশের ভেতরে ইসলামপন্থী শক্তিকে সাময়িকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। এটা স্পষ্ট: পুঁজিপতি শ্রেণি শ্রমিক শ্রেণির ভিতরে বিভাজন তৈরি করতে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শাসকগোষ্ঠী—যারা নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে—বাম, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল কণ্ঠস্বরকে ‘ইসলামবিরোধী’ বা ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী’ বলে চিহ্নিত করে তাঁদের দমন করার হুমকি তৈরি করতে পারে।
(২) ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর হুমকি:
১৯৭১-এর চেতনা ইতোমধ্যেই আক্রমণের মুখে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ—বিশেষ করে যদি পবিত্র স্থানগুলোতে হামলা হয় অথবা ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি ঘটে—তাহলে বাংলাদেশের জনমনে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া তীব্র হতে পারে। বামপন্থীসহ সকল গণতন্ত্রমনা মানুষের জন্য এখানে সমালোচনার বিষয় হলো: রাষ্ট্র কী করে? সে সময় রাষ্ট্র যদি শ্রেণি–সংহতি বা সাম্রাজ্যবাদ–বিরোধী চেতনা গড়ে তোলার বদলে রক্ষণশীল চাপের কাছে মাথা নত করে, তাহলে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আরও দুর্বল হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া) ওপর নিপীড়ন চাপিয়ে অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা করা হতে পারে।
৪। ভূ-রাজনৈতিক অধীনতা: জোট–নিরপেক্ষতার সঙ্কট:
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। বাংলাদেশের প্রচারিত ‘জোট–নিরপেক্ষ’ পররাষ্ট্রনীতি এখানে হুমকির মুখে পড়বে।
(১) ‘ভারসাম্য রক্ষা’র দ্বিধা:
বাংলাদেশের এক দিকে পশ্চিমা শক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য) ও অন্যদিকে পূর্বের শক্তি (চীন, রাশিয়া, ভারত) এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক। বড় কোনো যুদ্ধ—যাতে ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে—তখন বাংলাদেশের ওপর চাপ পড়বে পক্ষ নেওয়ার। যুক্তরাষ্ট্র তার ‘ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশল’-এ বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা সমৃদ্ধি চায় না, সে চায় চীনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত অংশীদার। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বেছে নিতে হবে—উপসাগরীয় তেল ও মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার মধ্যকার নির্ভরতা, না–কি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশীদারিত্বসহ আরও কোন বিকল্প ব্যবস্থা।
(২) রাষ্ট্রের সামরিকায়ন:
আঞ্চলিক যুদ্ধের আবহ রাষ্ট্রের সামরিকায়নকে ত্বরান্বিত করে। তখন শুরু হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ থেকে সম্পদ উড়িয়ে সামরিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জনবিরোধী নীতি। ‘আঞ্চলিক অস্থিরতা’র অজুহাতে রাষ্ট্র প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াবে, অস্ত্র কিনবে (যা পশ্চিমা বা যে কোন উৎস থেকে এসে পুনরায় নির্ভরশীলতা তৈরি করবে), এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সামরিক প্রভাব বিস্তার করবে। সামরিকায়ন কখনোই জনগণের পক্ষে থাকে না; এটি রাষ্ট্রের দমন–যন্ত্রকে শক্তিশালী করে, অথচ সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করার সামর্থ্য দেয় না।
(৪) রোহিংগা সংকট: প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্র না হতে পারে, কিন্তু পরোক্ষ দাবার ছক হতে পারে:
রোহিঙ্গা সংকট—যার বড় অংশ এখন বাংলাদেশ বহন করছে—পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির অস্ত্র ও সমর্থন পায়। পশ্চিম এশিয়ায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি মিয়ানমারের দায় থেকে সরে যাবে। সত্যি বলতে হলে, এটাই বলতে হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা এখন রোহিঙ্গা সংকটকে পশ্চিমা ও অন্যান্য শক্তির কাছে কৌশলগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, মানবিক সংহতির বদলে বাস্তুচ্যুত মানুষকে ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুটিতে পরিণত করেছে – কিন্তু দায় বহণ করতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে।
(৫) উপসংহার: বর্তমান ভূ-রাজনীতির বিকল্প—জোট–নিরপেক্ষতা, আঞ্চলিক ঐক্য ও শ্রেণি–সংহতি:
সামগ্রিক আলোচনা থেকে যে সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত তাহলো , পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর যে প্রভাব ফেলবে, তা সব দিক থেকেই ধ্বংসাত্মক—রেমিট্যান্স বন্ধ হয়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের দুরবস্থা, রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা চরমে ওঠা, এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ।
বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক শক্তিগুলি, যাঁরা নব্য উদারবাদী পুঁজিবাদ ও বাণিজ্যিক–মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই কাজ করেন, তাঁদের কেউই প্রকৃত সার্বভৌমত্বের পথ দেখায় না।
তাই এই সংকটে একটি স্পষ্ট ও বিকল্প পথ হতে পারে:
(১) রেমিট্যান্স–নির্ভরতা কমানো, কৃষি ও স্থানীয় বাজারের জন্য শিল্পায়ন (আমদানি প্রতিস্থাপন), এবং জ্বালানি খাতে সরকারি মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
(২) সব ধরণের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে—মার্কিন, ন্যাটো কিংবা তাদের আঞ্চলিক ভাড়াটে শক্তি—একটি জনআন্দোলন গড়ে তোলা। বামপন্থী এবং গণতন্ত্রমনা মানুষকে বলতে হবে, বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের শত্রু ইরান বা ইসরায়েলের জনগণ নয়; শত্রু হলো সেই যুদ্ধ–অর্থনীতি, যা ধনী–গরিবের ব্যবধান আরও প্রশস্ত করে।
(৩) ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলা । ১৯৭১-এর চেতনাকে সাম্প্রদায়িকতা ও সামরিক কর্তৃত্ববাদ—উভয়ের বিরুদ্ধেই রক্ষা করতে হবে। এ জন্য ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ও শ্রমজীবী শক্তির ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে সে জনকল্যাণকে ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ওপর প্রাধান্য দেয়।
(৪) আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সকল রাষ্ট্রের শ্রমিক-কৃষক, মধ্যবিত্ত এবং সকল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতার মূলধারায় এনে, কোন ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের হাতিয়ার না বানিয়ে, যৌথ আত্মনির্ভরতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পুনর্জাগরিত করা—যাতে অঞ্চলের দেশগুলো বহিরাগত শক্তির যুদ্ধের ধাক্কা যৌথভাবে সামলাতে পারে।
সচেতন, সংগঠিত ও শ্রেণিভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে না তুলতে পারলে বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দৃষ্টিতে যা ছিল তাই হয়ে থাকবে, যেমন সস্তা শ্রমের আধার, অস্ত্র কিনতে বাধ্য বাজার এবং নিরাপত্তা–বাফার জোন—যার ক্ষতি সর্বদা বহন করবেন শ্রমজীবি মানুষ। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ বাংলাদেশের যুদ্ধ নয়। কিন্তু বামপন্থীরা এবং সত্যকারের গণতন্ত্রীরা যদি জোট–নিরপেক্ষতা ও সাম্রাজ্যবাদ–বিরোধী সংহতির পথ না দেখাতে পারে, তাহলে তার মূল্য চোকাতে হবে সাধারণ মানুষকেই—ইতিহাসে বারবার যেভাবে হয়েছে।
লেখক- অধ্যাপক ড. এস কে দাস



