আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের উত্তাপে: উপেক্ষিত অর্থনীতি, কৃষি, নারী, শ্রম,দারিদ্র এবং আদিবাসী: নির্বাচনের পরপর পবিত্র রমজান ও ঈদ: এলডিসি উত্তরণের সিদ্ধান্ত: নির্বাচিত সরকারের উপর বর্তাবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়: রাজনীতি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রগতির!/
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট আগামী নির্বাচনে হয়তো সাময়িকভাবে কেটে যাবে বা জনগণের মতামত পাওয়া যাবে। নির্বাচনের বাকি আর দু’সপ্তাহের কম সময়। দিন দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি খুব উচ্চৈস্বরে প্রকাশ করছে। সামনে হয়তো আরও প্রতিশ্রূতি আসবে। আপাতত যেসব প্রতিশ্রুতি প্রকাশিত হয়েছে তা কল্যাণমুখী কিছু প্রতিশ্রুতি মাত্র । এগুলো সামাজিক সুরক্ষা জালের মধ্যে পড়ে। অতি দরিদ্র, বেকার এবং দরিদ্রের জন্য এগুলো প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশে আছে। বাংলাদেশে এগুলো কিছু আছে আর কিছু সম্প্রসারিত হবে। কিন্তু এগুলো সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয় নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা চৌপথের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে আছে। এই বছর তার এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। অন্তর্বর্তী সরকার এবিষয়ে গতানুগতিক পথে হাঁটছে কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা কম করে তিন বছর পেছাতে হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন বিশেষ করে কোভিট-১৯ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ অপ্রতুল। শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য মন্দা। আর সরকার বলছে, জাতিসংঘের পর্যালোচনা চলুক। পর্যালোচনা শেষে বুঝা যাবে বিভিন্ন সূচকের অবস্থা কি। আর এলডিসি উত্তরণের পর ব্যবসায়ীরা যে ভয় পাচ্ছে তা তেমন বাঁধা হবে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন এলডিসি উত্তরণের পর ধীরে ধীরে শুল্ক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এই সামগ্রিক বিষয় গড়িয়ে পড়বে সামনের নির্বাচিত সরকারের উপর কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এখনো এই বিষয়ে কিছু বলছে না।
ইতোমধ্যেই আইএমএফ বলছে নির্বাচিত সরকারের আগে তারা পরবর্তী ঋণের কিস্তি ছাড়বে না। ফলে এখন প্রবাসী আয় থেকে রেমিট্যান্স আসছে বিধায় রিজার্ভ নিয়ে টেনশন কম। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতি অনেকটা অনির্ভরশীল। এতে শিল্প ও রপ্তানি তেমন বাড়ে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলো শিল্পায়নের কোনো নীতিমালা ঘোষণা এখনো করেনি। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ কীভাবে মোকাবিলা করবে সেই বিষয়েও কেউ কিছু বলেনি। বিষয়টা অনেকটা এরকম, ক্ষমতায় আসলে সব দেখা যাবে। কিন্তু তাতে উন্নতি কি হবে? এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে অবহেলা করেছে কৃষি বিষয়ে কোনো নীতিমালা ঘোষণা না করে। বাংলাদেশের কৃষি একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃষি উপকরণ ও কৃষি পণ্যের দাম কীভাবে বাজার সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাঁচিয়ে কৃষককে পণ্যের ন্যায্য দাম এবং বাজারকে স্থিতিশীল রাখবে তার কোনো রূপরেখা রাজনৈতিক দলগুলো দেয়নি। অথচ, একসময় রাজনীতির শ্লোগান ছিল, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষি ও কৃষক নির্বাচনে গুরুত্ব পায়নি। এতে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি এবং সিন্ডিকেট সামলিয়ে কীভাবে কৃষি এগুবে তার পথরেখা পাওয়া গেলো না।নারীদের অবস্থা মনে হয় সবচেয়ে ত্রিশঙ্কু অবস্থা। নারীরা খুব সরব কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের বিষয়টা গতানুগতিক ধারা বজায় রেখেছে। নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বেশ চাপে আছে। অর্থনৈতিক অধিকার তো রাজনীতির বাইরে নয়। এটা বেশ মজার, নারী অধিকার নিয়ে সাধারণত এনজিওরা কাজ করে কিন্তু এই অনেকটা এনজিও – প্রধান সরকার নারীদের অগ্রগতির জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
শিল্প বা শ্রমের কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্ট কোনো নীতিমালা ঘোষণা করেনি। শিল্পের অবস্থা খুব খারাপ। বেকার হয়েছে,বহু কারখানা পুড়ে যাওয়ায় বা বন্ধ হয় যাওয়ায়। নতুন করে দরিদ্র হয়েছে প্রায় কয়েক কোটি লোক। জনসংখ্যার প্রায় ২৮% দরিদ্র মানুষ। তাদের কর্মসংস্থান বা ন্যূনতম মজুরির কথা কেউ বলছে না। আর আদিবাসী! এই নির্বাচনে বরং আদিবাসী ইস্যু আরও জটিল হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে ইনক্লুসিভ মানে আদিবাসী কীনা তা স্পষ্ট নয়। কেউ জাতীয়তাবাদের বেশি কিছু বলেনি।সবশেষে, এটা বলা যায়, পরিবেশ এবং দারিদ্র্য বিমোচন নীতিমালা কী হবে তাও কেউ বলেনি। নির্বাচনে সবাই রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছে এমনকি সরকারও। কিন্তু মানুষের দরকার একটা শক্তিশালী অর্থনীতির যেখানে গরীব মানুষ এবং শিল্প মালিক সকলের আইনসিদ্ধ অধিকার বাস্তবায়ন হয়। রাজনীতি অর্থনীতিকে খেয়ে দিয়ে আমাদের দূর্গতি বাড়িয়েই দিবে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায় গড়িয়ে যাবে নির্বাচিত সরকারের উপর। তাই, নির্বাচনপরবর্তী সময় সত্যিকার চ্যালেন্জ নিয়ে আসবে নির্বাচিত সরকারের জন্য।
লেখক- শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক


