সম্প্রতি বাংলাদেশ- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া শেষ হলো। এক সপ্তাহের এই মহড়ার আনুষ্ঠানিক নাম: অপারেশন প্যাসিফিক এঞ্জেল ২৫-৩। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এই মহড়া নিয়ে গত এক সপ্তাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা হয়েছে। এইসব আলোচনা- সমালোচনা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে কীনা সে-সব প্রশ্নকে সামনে এনেছে। কিন্তু এরচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সামরিকভাবে কোয়াড বা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো- প্যাসিফিক পরিকল্পনার শারীরিক অংশ হয়ে যাচ্ছে কীনা।
গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো- প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশকে সদস্য হিসেবে পেতে চাইছে। বাংলাদেশের ভূ- রাজনৈতিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে দুটি সামরিক বিষয় এখন স্পষ্ট। একটা হলো, ইন্দো- প্যাসিফিক জোট অন্যটি হলো, আরকান আর্মির জন্য করিডোর। এই করিডোর মানবিক কারণে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো তার বার্মা প্যাক্ট বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সাথে পাওয়া যাতে তার ভূমি ব্যবহার করা যায়। অন্য দিকে, কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে বাংলাদেশকে পাওয়া গেলে বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক সুবিধা বেড়ে যাবে। গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের এই চাওয়ার পেছনে বাংলাদেশের সম্মতি ছিল ধীরগতির। কিন্তু এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার অনূকূলে হওয়ায় পর্যবেক্ষকদের সন্দেহ তার গতি বেড়ে গেলো কীনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই সন্দেহকেই তুলে ধরার চেষ্টা করছে বলে মনে হয়।
এবার আসা যাক, বাস্তব পরিস্থিতির দিকে।
অপারেশন প্যাসিফিক এঞ্জেল ২৫ কে আইএস পিআর বলছে, এই মহড়া দুই দেশের বিমান ও সেনাবাহিনীর মধ্যেকার অনুশীলন যেখানে, বন্যা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অন্যান্য দূর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে। অন্য দিকে, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানাচ্ছে, এই মহড়ার মাধ্যমে একটা মুক্ত ও নিরাপদ প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। আর প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া উভয় দেশের সৈনিকরা এন্জেলের ভূমিকা পালন করবে।
গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সাথে বাংলাদেশের যৌথ মহড়া চলছে। এছাড়াও, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও নানা প্রশিক্ষণ নেয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। এটা দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্কের অগ্রগতি। কিন্তু এবার, দুই দেশের মহড়া হলেও তা প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কীত হয়েছে।

এই ইন্দো- প্যাসিফিক অঞ্চল বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক নীতি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কৌশল। এই কৌশলের প্রধান লক্ষ্য হলো ভারতমহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অঞ্চলকে নৌপরিবহন ও বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ রাখা। এখানে সকলের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত রাখা। কিন্তু এটা আবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেরও অংশ। এই কৌশল তাক করে আছে, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সীমিত করার জন্য। সম্প্রতি সাউথ চায়না সি- তে চীনের প্রভাব দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, জাপান এবং আশিয়ান দেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। এই অঞ্চলে তাই ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশকে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলের বন্ধু হিসেবে পেয়েছে। বিশেষ করে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ভারত যুক্ত হয়েছে তার চীনবিরোধী ভূরাজনৈতিক স্বার্থে। ফলে, বাকি ছিল বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এবার বাগে পেয়েছে। বাংলাদেশের সাথে শুল্ক চুক্তির সময় কিছু নন ডিস ক্লোজার শর্ত জুড়ে দিয়েছে, আর তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই অপারেশন প্যাসিফিক এন্জেল ২৫ এ।
প্রতীকী ভাবে বলা যায়, সামরিক ভাবে বাংলাদেশের অবস্থা কালুরঘাটের মুড়ির টিন বা পুরনো মডেলের বাসের মতো। চট্টগ্রামের একটা জনপ্রিয় গান, কালুগাইট্টা মুড়ির টিন যার মর্ম হলো, ধীরগতির বাস। কিন্তু তাতে কি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় সেতো সুপারসনিক হতে পারে। যেমন, শুল্ক চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দামী সামরিক বিমান কিনছে। এগুলো, দেশের নিরাপত্তার কাজে যেমন লাগবে তেমনি প্যাসিফিকের নিরাপত্তার কাজেও লাগতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ভবিষ্যত কি এই কোশলে নিরাপদ হবে?
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো নাজুক অবস্থায়। সরকার ও ব্যবসায়ীরা ভাবছে তারা বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেবে। সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টিকফা চুক্তি, শুল্ক চুক্তি, নন- ডিস ক্লোজার শর্ত তাকে প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক কৌশলে নিয়ে যায় তবে তা অত্যন্ত বিপদজনক হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক তাতে অবনতি হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি আঘাতপ্রাপ্ত হবে। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বার্মা প্যাক্টের অংশ হলে, ভারত, চীন ও মায়ানমারকে মোকাবিলা করতে হবে। তখন রাশিয়াও বাংলাদেশের পক্ষে থাকবে না। এত বড় দায় নেবার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই।
যাইহোক, বাংলাদেশের পরিবর্তীত অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিতে যুক্তরাষ্ট্র পিছ পা হবে না। বাংলাদেশ একটা ভয়াবহ সামরিক বন্ধুত্বে জড়াবে যেখানে তার অর্থনৈতিক ভবিষ্যত তেমন নেই কিন্তু বিপদ আছে।
আর জনগণের এতে তেমন কোনো সম্মতিও নেই। অরাজনৈতিক সরকারের উচিত ছিল রাজনৈতিক সরকারের জন্য অপেক্ষা করা। কারণ, যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব সংকটে না পড়ে এবং স্বাধীনতা বিপন্ন না হয়।



